বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: ব্যবসা ও ভূরাজনীতি গুরুত্ব পাবে পল কাপুরের সফরে

· Prothom Alo

  • বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ের প্রথম সফর এটি।

  • পল কাপুর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ডোনাল্ড লুর জায়গায় নিয়োগ পেয়েছেন।

    Visit lebandit.lat for more information.

ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর আগামী মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ডোনাল্ড লুর জায়গায় নিয়োগ পাওয়ার পর এটা তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। ঢাকার আগে তিনি দিল্লি সফরে যাবেন।

ঢাকা সফরের সময় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন পল কাপুর। ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দিল্লি হয়ে ঢাকায় পল কাপুরের তিন দিনের সফরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সূত্রগুলো ৩ থেকে ৫ মার্চ পল কাপুরের ঢাকা সফরের বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে নিশ্চিত করেছে। অতীতের প্রসঙ্গ টেনে কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক মাস না যেতেই পল কাপুরের ঢাকা সফর তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য থাকার মধ্যে ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল তখনকার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুকে। তিনি ২০২৩ সালের নভেম্বরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন, যা ছিল ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনের আগের ঘটনা। আর এবার নির্বাচনের পর যে পল কাপুর ঢাকা সফরে আসবেন, সেটা গত মাসের শুরুতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন।

খসড়া সূচি অনুযায়ী, পল কাপুর মঙ্গলবার রাতে দিল্লি থেকে ঢাকায় পৌঁছাবেন। পরদিন, অর্থাৎ ৪ মার্চ তিনি মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দিনের দ্বিতীয় ভাগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। সফরের শেষ দিনে তিনি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বাণিজ্য, ভূরাজনীতি

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে পল কাপুরের ঢাকায় আসা হবে দেশটি থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ের প্রথম সফর। ফলে আগামী দিনগুলোতে সম্পর্কের পথনকশা কেমন হবে এবং কার কোথায় অগ্রাধিকার, তা এই সফরে অনেকটা স্পষ্ট হবে।

দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ ফেব্রুয়ারি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, বাণিজ্যচুক্তির বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের প্রসঙ্গ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পল কাপুরের ঢাকা সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠির আলোকে আলোচনা হতে পারে।

পল কাপুরের ঢাকা সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টি যে গুরুত্ব পাবে, তা গত সপ্তাহে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। ওয়াশিংটনের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, পল কাপুরের সফরসঙ্গী হিসেবে ঢাকা সফরে থাকবেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা লরা অ্যান্ডারসন।

ওয়াশিংটন থেকে আরও জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে পল কাপুরের সফরে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি।

বাংলাদেশের সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষাচুক্তি জিসোমিয়া ও আকসা সই করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে জিসোমিয়া নিয়ে আলোচনা অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকা এসেছিল। এ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল এ নিয়ে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসেও আলোচনা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি পল কাপুরের সফরে গুরুত্ব পাবে।

ওয়াশিংটন, দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলোতে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ভারত হয়ে বাংলাদেশে পল কাপুরের সফরে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও আগ্রহের বিষয়টি আলোচনায় আসবে, বিশেষ করে চীনের প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে আসার বিষয়টি আবার সামনে আনবে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি তিনি তুলবেন, বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত ইতিবাচক সম্পর্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বার্তা থাকতে পারে। তবে ঢাকা মনে করে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে দিল্লির বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

ভিসা আর বাণিজ্যে জোর বাংলাদেশের

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কের বিষয়ে বাণিজ্যচুক্তি সই করেছিল। কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ কী, পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থান জানতে চাইবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের তালিকা থেকে ব্যবসায়ীদের বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে বি-১ শ্রেণিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি তুলবে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা বজায় রাখার প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট যে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাংলাদেশকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। এখানে বাংলাদেশের ভূমিকা কেমন হবে, সেটা পল কাপুর বোঝার চেষ্টা করবেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের চিঠিতে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট। তাই জিসোমিয়া ও আকসার মতো প্রতিরক্ষাচুক্তি যাতে দ্রুত সই হয়, সে বিষয়টিও এই সফরে পল কাপুর তুলবেন বলে ধারণা করা যায়।

Read full story at source