‘সিন্ডিকেট করে’ বন্ধ রাখা পাম্পগুলো প্রশাসন দিয়ে চালালে কী হয়?
· Prothom Alo

হিব্রু ভাষায় বেশ প্রচলিত একটি বাগধারা হচ্ছে ‘চুৎস্পাহ’। এর বাংলা হচ্ছে ‘চরম ধৃষ্টতা’। এই চুৎস্পাহ কেন্দ্র করে হিব্রু ভাষায় বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে।
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
একটি গল্প এমন—এক ছেলে নিজের মা–বাবাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। পরে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে হাজির করে আদালতে। সেখানে বিচারকের উদ্দেশে ছেলেটি বলে, ‘মহামান্য, আমার প্রতি দয়া করে সহানুভূতি রেখে বিচার করবেন।’ ওই ছেলের কথা শুনে বিচারক তো অবাক! বিচারক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি নিজের মা–বাবাকে হত্যা করেছ, আমি কোন দুঃখে তোমার প্রতি সহানুভূতি দেখাব!’ জবাবে কাঁদো কাঁদো গলায় ছেলেটি বলল, ‘সহানুভূতি দেখাবেন কারণ, আমি তো অনাথ, আমি তো এতিম!’
একেই বলে চুৎস্পাহ বা চরম ধৃষ্টতা। আর এমনই চরম ধৃষ্টতার নজির হিব্রু গল্পের আসর ছেড়ে যেন গেড়ে বসেছে বাংলাদেশের তেলের পাম্পগুলোতে।
রাস্তায় তেলের পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখন এক পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এই সারি যখন রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায় এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর জানা যায় ‘তেল নেই’, তখন আর তা কেবল সাধারণ ভোগান্তি থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় একটি নাগরিক অবমাননা।
যেসব পাম্পের মালিক তেল থাকতেও সংকট দেখাবে কিংবা জরিমানা করায় পাম্প বন্ধের হঠকারী ঘোষণা দেবে, রাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশ জারি করে সেসব পাম্প অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসনের জনবল বা সেনাবাহিনী/বিজিবির তদারকিতে নিয়ে এসে পরিচালনা করতে হবে। যাতে জ্বালানি সরবরাহ একমুহূর্তের জন্যও বন্ধ না থাকে।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে যখন অস্থিরতার একটা আচ্ছন্ন সংকেত রয়েছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট সেই সুযোগ ব্যবহার করছে নিজেদের আখের গোছাতে। তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও ‘তেল নেই’ বলে মানুষকে কষ্ট দেওয়া এবং প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে গেলে উল্টো ‘ধর্মঘট’ ডেকে পুরো দেশ অচল করে দেওয়া—এই যে ধৃষ্টতা, তা চুৎস্পাহরই উদাহরণ।
এমন ধৃষ্টতার সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি সিলেটের। সেখানে অবৈধভাবে তেল মজুত করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছেন। কোনো সুসভ্য রাষ্ট্রে এমন অন্যায়ের পর লজ্জিত হওয়া এবং জরিমানা পরিশোধ করে সংশোধন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হয়েছে উল্টো।
পাম্পমালিকেরা সম্মিলিতভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব পাম্প বন্ধ করে দিয়েছেন; অর্থাৎ তাঁরা বার্তা দিচ্ছেন—আমরা চুরি বা অন্যায় করব, কিন্তু আমাদের সাজা দেওয়া যাবে না; সাজা দিলেই আমরা জনজীবন বিপর্যস্ত করে দেব। এটা তো ব্যবসার কোনো ধরন হতে পারে না। এটা তো প্রকাশ্য ব্ল্যাকমেল।
জ্বালানি তেল কিনতে যানবাহনের চালকদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছেএর আগে রংপুরে তেল চুরির দায়ে তিনজন শ্রমিককে সাজা দিয়েছেন আদালত। শ্রমিকের স্বার্থ দেখার নামে যে ‘ট্যাংক-লরি শ্রমিক ইউনিয়ন’ রাজনীতি করে, তারা তখন চোরের পক্ষে কোমর বেঁধে নামে। নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ আটটি জেলায় তেল সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় স্রেফ ওই অপরাধীদের মুক্তির দাবিতে।
একজন চোরকে বাঁচাতে বা আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে পুরো একটি বিভাগকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা এরা কোত্থেকে পায়? এর ফলে ওই অঞ্চলের কৃষক সমাজ পড়ে চরম হুমকির মুখে। ডিজেলের অভাবে সেচ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আর সেচ বন্ধ হওয়া মানে হলো দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় ধস নামানো।
শুধু সিলেট বা রংপুর নয়, এর আঁচ আছড়ে পড়ছে খোদ রাজধানীতেও। রাজধানী ঢাকা এমনিতেই পরিবহনের চাপে নাজেহাল। জ্বালানির এই সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা রাজধানীমুখী লরি চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। পাম্পে যখন সরবরাহ সীমিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে গণপরিবহনে।
৩ দিন অনলাইন ক্লাসে কত লিটার ডিজেল বাঁচবে?ঢাকার প্রধান পাম্পগুলোর সামনে মাঝরাত থেকেই তেলের আশায় প্রাইভেট কার, বাস ও মোটরসাইকেল লাইন লেগে থাকছে। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সময়মতো না আসায় রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। দেশের লাইফলাইনখ্যাত চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক কিংবা উত্তরবঙ্গের লাইফলাইনে জ্বালানির অভাব তৈরি করা মানে হচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতির পালে নতুন করে হাওয়া দেওয়া।
যখন বিশ্ববাজারে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার একটা আশঙ্কা আছে, বাংলাদেশ সরকার তখন ঘোষণা দিচ্ছে যে জাতীয়ভাবে জ্বালানি মজুতের কোনো ঘাটতি নেই।
বিপিসি বা সরকার আমদানির ধারা স্বাভাবিক রেখেছে; অর্থাৎ তেল দেশে আছে, কিন্তু সেই তেল সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে মাঝখানের এই অদৃশ্য হাত—যাকে আমরা ‘সিন্ডিকেট’ বলে জানি। তেলের দাম ভবিষ্যতে বাড়বে—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে মালিকেরা যে মজুত গড়ে তুলছেন, তার মাশুল দিচ্ছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর জ্বালানি তেল নিচ্ছেন একজন মোটরসাইকেলচালক। গত শনিবার সকালে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনেসবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, প্রশাসন যখন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে জেল-জরিমানা দিচ্ছে, তখন এসব ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠন তাদের স্বার্থরক্ষায় ‘জিম্মি রাজনীতি’ শুরু করে। তারা মনে করে, পাম্প বন্ধ করে দিলে সরকার চাপে পড়ে পিছু হটবে।
গত কয়েক দশকের সংস্কৃতি আমাদের দেখিয়েছে যে পরিবহন সেক্টর এবং জ্বালানি খাতের এসব সিন্ডিকেটের কাছে বারবার সরকারগুলোকে নতজানু হতে হয়েছে। আর এই নমনীয়তাই আজ তাদের আস্পর্ধাকে এমন জনস্বার্থবিরোধী অবস্থানে নিয়ে গেছে। কোনো বিচার মানবে না, কোনো চুরির দায়ে শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা যাবে না—এই যদি হয় একটি শ্রেণির জেদ, তবে রাষ্ট্র আসলে চালাচ্ছে কারা?
এ দেশের কৃষকেরা পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছেন না, ডিজেল নেই সেচের জন্য। রোদের তীব্রতায় ফসল নষ্ট হচ্ছে। অথচ সরকার তাঁদের জন্য ভর্তুকি দিচ্ছে। এই ভর্তুকি কার পকেটে যাচ্ছে? কৃষকের ভাগ্যের চেয়ে পাম্পমালিকদের লোভ আজ অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে তেলের লোভে ট্রাক ও বাসের সিরিয়ালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হচ্ছে সাধারণ যাত্রী ও চালকদের। অর্থনীতির চাকা যেখানে গতি পাওয়ার কথা, সেখানে স্থবিরতা নেমে আসছে কৃত্রিম এই সংকটের কারণে।
এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের শক্তি বড় না সিন্ডিকেটের? সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যখন পুরো একটি খাত সেবা বন্ধের ডাক দেয়, তখন বিকল্প ব্যবস্থা কী আছে? রাষ্ট্রের কাছে যদি কোনো বিকল্প না থাকে, তবে এ ধরনের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
আমরা দেখেছি, অতীতে পরিবহন ধর্মঘট ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে গেছে, লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও এখনই চরম পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। যারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বন্ধ করার জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখে, তাদের লাইসেন্স তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করার সাহস রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বা ইরান যুদ্ধে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা সব যুদ্ধের বিরোধী। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমাদের সেটা গ্রহণ করতেই হবে। কিন্তু দেশীয় চোর ও মজুতদারেরা যদি সংকট না থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি করে, তবে সেই ধৃষ্টতা মেনে নেওয়া মানে হচ্ছে আইনের শাসনের চূড়ান্ত অবমাননা।
প্রশাসনকে কেবল জরিমানা বা সাময়িক কারাদণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক, সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে সরাসরি ডিলার পয়েন্ট বা পয়েন্টগুলোতে জ্বালানি বিতরণের বিকল্প মডেল চিন্তা করতে হবে।
এই দেশের মানুষ অনেক দুর্যোগ সহ্য করেছে। মুষ্টিমেয় কিছু তেল ব্যবসায়ী ও সুবিধাভোগী শ্রমিক সংগঠনের আস্ফালনে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে না। সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, এই ‘জিম্মি করার’ অপসংস্কৃতি আর চলতে দেবেন না।
যেসব পাম্পের মালিক তেল থাকতেও সংকট দেখাবে কিংবা জরিমানা করায় পাম্প বন্ধের হঠকারী ঘোষণা দেবে, রাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশ জারি করে সেসব পাম্প অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসনের জনবল বা সেনাবাহিনী/বিজিবির তদারকিতে নিয়ে এসে পরিচালনা করতে হবে। যাতে জ্বালানি সরবরাহ একমুহূর্তের জন্যও বন্ধ না থাকে।
রাষ্ট্রীয় মজুতে তেল থাকলে সেই তেল জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়বদ্ধতা। এই সরবরাহ পথে যারা কৃত্রিম দেয়াল তুলবে, তাদের কেবল জরিমানা নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে পাম্পের মালিকানা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হবে এবং সাধারণ জনবল দিয়ে তা নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে।
দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ও আইন অমান্য করে পাম্পমালিকদের এই পেশিশক্তির আস্ফালনে দেশ আর জিম্মি থাকতে পারে না। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র ব্যক্তিমালিকানার পাম্পের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে পারে না।
চুরির আসামিকে ছাড়ানোর নামে দেশ অচলকারীদের এবং অবৈধ মজুতদারদের ব্যবসা চিরতরে গুটিয়ে দেওয়ার এখনই সুযোগ। পাম্প জব্দ করার আইনি পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে কেউ আর সারা দেশের মানুষের সঙ্গে এমন চুৎস্পাহ করার সাহস পাবে না। জনগণের তেল, জনগণের কৃষি আর জনগণের দেশ কোনো সিন্ডিকেটের মর্জিতে অচল হতে দেওয়া যাবে না।
সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব