শিক্ষাক্রমে কাজের ভাষা শেখা আবশ্যিক করা প্রসঙ্গে
· Prothom Alo
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় নির্বাচনের পরপরই সাংবাদিকদের সামনে প্রেস ব্রিফিংয়ে ইংরেজিতে কথা শুরু করেন বিদেশিদের জন্য এবং তারপর বাংলায় দেশের লোকদের জন্য। এটা উনি না করলেও ক্ষতি ছিল না, একে তো সেটা ছিল ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর বিদেশি সাংবাদিকেরা প্রস্তুতি নিয়ে আসেন দেশি ভাষায় দেওয়া বক্তব্যকে বোঝার জন্য। তবু তারেক রহমান শুরুতেই সংক্ষেপে তাঁর বক্তব্য ইংরেজিতে হাজির করে নিলেন। এই ছোট সদাচরণটি আমাদেরকে একটা সুযোগ করে দেয় নতুন সরকারের কাছে বাংলাদেশের জন্য একটি প্রায়োগিক এবং ব্যবহারিক ভাষানীতির দাবি তুলে ধরার। একটি বাস্তববাদী ভাষানীতি ও পরিকল্পনা এই দেশের জনশক্তিকে আরও দক্ষ এবং স্বনির্ভর করে গড়ে তুলবে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে চীনা বিনিয়োগকারীদের কারখানা স্থাপন, গালফ দেশগুলোর নিয়োগকর্তাদের শ্রমিক চাহিদা, ভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রতিবেশীদের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং জাপানি-কোরিয়ান অংশীদারদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় সেসব দেশের ভাষা জানা জনশক্তি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। সে কারণে আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত এবং ধর্মীয় ইত্যাদি দিক থেকে বিচার করলে যেসব ভাষা জানা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যক বিবেচিত হবে, সেগুলোকে রাষ্ট্রের জন্য দরকারি ভাষাসমূহ বা ‘ক্রিটিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট) নামে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। এবং একই সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীরা যাতে পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই সেই ভাষাগুলো শিখে নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই লেখায় আমি তেমন একটি ভাষানীতির প্রয়োজনীয়তার পেছনের প্রেক্ষিত তুলে ধরে তা বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা হাজির করার প্রয়াস নিয়েছি।
Visit rocore.sbs for more information.
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার জোটবন্ধনগুলো পরিবর্তনশীল, চাকরির বাজার অস্থির এবং ডিজিটাল বিনিময় অবিরাম। বিদেশি ভাষা শেখা মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সুবিধাজনক অতিরিক্ত’ কোনো ব্যাপার নয়; এটি এখন একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামোর অংশ, ঠিক যেমন কম্পিউটার, তথ্যপ্রযুক্তি আর ডিজিটাল সাক্ষরতা। বাংলাদেশ ১৭০ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার একটি দেশ, যার বছরে উৎপাদিত জনশক্তি দেশের চাহিদা মিটিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় উদ্বৃত্ত থাকে, তাদের বিদেশের বাজার ধরতে হয়। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ভাষা জানা তো বাধ্যতামূলক। আবার দেশের বাজারেও বিদেশি সংস্থা আছে, যেখানে বিদেশি ভাষা জানাটা দক্ষতা হিসেবেই গণ্য হয়। বাস্তব চিত্রও তাই বলে, দেশের বহু খাতে ইংরেজি জানা কর্মীরা বেশি আয় করেন, তেমনি আরবি জানা শ্রমিকেরা গালফে ২০-৩০ শতাংশ বেশি মজুরি দাবি করতে পারেন (ঢাকা ট্রিবিউন, ২০২৪; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২১; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৩), যা রেমিট্যান্স বাড়িয়ে জিডিপি শক্তিশালী করে। অর্থাৎ ভাষাদক্ষতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি, তাই সময় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাশিক্ষাকে জাতীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করার।
বাংলা কেন্দ্রে, অনেক ভাষা টেবিলে
জাতীয় ঐক্য গঠনে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতির ইতিহাসে একটি অনুপম দায়িত্ব পালন করেছে। বাংলাদেশ আন্দোলনকে পরিণতি দিতে ভাষা আন্দোলনের অবদান অপরিসীম। এটি আমাদের জাতীয় চেতনার সঙ্গে মিশে আছে। ফলে বাংলা রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের অর্থাৎ আইন প্রণয়ন, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগের ভাষা হিসেবে থাকছে। আমাদের জাতীয় যোগাযোগ এবং শিল্প–সাহিত্যের ভাষা হিসেবেও বাংলা বিরাজ করছে। এটি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে বাংলার প্রতি ভালোবাসা অন্য ভাষা জানা ও ব্যবহারের বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, বিশেষ করে যখন অন্যান্য ভাষা শেখা ও ব্যবহার করা জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে হয়। অন্য ভাষা শিখে তার অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ভাষাশিক্ষার প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে সর্বজনীন ও সহজলভ্য না করতে পারা এবং শিক্ষাপদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন না করতে পারা। প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বাংলাদেশের একটি দরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এটি কলেজ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক এবং উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি এবং আন্তর্জাতিক গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে ইংরজি শিখছেন এবং এই বাড়তি ভাষিক দক্ষতার জন্য বিশ্বের কর্ম এবং একাডেমিক বাজারে অংশগ্রহণ করতে পারছেন। এই সংখ্যা অবশ্যই সন্তোষজনক না (নায়েক, ২০২৪)। তা ছাড়া বড় বড় শহরগুলোর সঙ্গে ছোট শহর বা গ্রামের ইংরেজি শিক্ষার শিক্ষক ও উপকরণগত বৈষম্য আছে। তবু এর মাধ্যমে একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের জনশক্তি যদি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি বিদেশি ভাষা শেখে, তা বিফলে যায় না (হোসাইন ও রহমান, ২০২৩)। এটা থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, ইংরেজি জানার সুবিধা যেন সর্বস্তরের জনগণ পায় এবং ইংরেজির সঙ্গে আরও যত ভাষা জেনে এই আধুনিক বিশ্বে লাভবান হওয়া যায়, সেসব ভাষা শেখানোর দায়িত্ব যেন সর্বজনের সরকার হাতে তুলে নেয়।
বিশেষ কিছু ভাষা কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের লাখ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতে কাজ করেন। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক সরকারি আরবি প্রশিক্ষণ এখনো সীমিত এবং প্রায়ই খুব সংক্ষিপ্ত। চীন, জাপান, কোরিয়া এবং ইউরোপের কোম্পানিগুলো আমাদের কারখানা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে। কিন্তু আলোচনা এবং চুক্তি সাধারণত ইংরেজি বা দোভাষীর মাধ্যমে হয়। আমাদের ছাত্ররা জার্মানি, ফ্রান্স বা জাপানে স্কলারশিপের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অধিকাংশেরই সেই ভাষায় প্রাথমিক ভিত্তিও নেই। গালফে ১০ লাখ শ্রমিক আরবি না জেনে চাকরি হারান বা কম মজুরি পান, যা বার্ষিক ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি (ঢাকা ট্রিবিউন, ২০২৪; বিএইচআরআরসি, ২০২৪)। দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ চিন্তা করুন: একজন তৈরি পোশাক রপ্তানিকর্তা যিনি ম্যান্ডারিন বা জাপানিতে আলোচনা করতে পারেন, তাঁকে নিজের ব্যবসা ব্যাখ্যা করার জন্য অন্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না—এতে চুক্তি দ্রুত হয় এবং লাভ বাড়ে। বিদেশে তাঁর তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে আরবিতে যোগাযোগ করতে পারা একজন নির্মাণশ্রমিক ঘণ্টা, নিরাপত্তা বা মজুরি নিয়ে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম, যা দুর্ঘটনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমায় (ইউরোপীয় কমিশন, ২০০৬)। জার্মান বা জাপানি জানা একজন নার্স বিশ্বমানের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ এবং চাকরি পেতে পারেন, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে উন্নত করে। ফরাসি বা জার্মান স্কলারশিপে পড়তে পারা একজন তরুণ গবেষক নতুন ধারণা সরাসরি বাংলাদেশি ক্লাসরুম বা ল্যাবে নিয়ে আসতে পারেন, যা গবেষণায় উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে, ‘গুরুত্বপূর্ণ ভাষা’ হলো সেগুলো, যা বাংলাদেশের কূটনীতি, বাণিজ্য, শ্রম অভিবাসন, উচ্চশিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের দরজা খোলে। আমাদের জন্য এগুলো স্পষ্টতই ইংরেজি, আরবি, চীনা, হিন্দি-উর্দু, জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান, ফরাসি ও রাশিয়ান ইত্যাদি। তালিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু নীতি একই। আর তা হলো আমাদের জাতীয় স্বার্থ অগ্রসরকারী ভাষাগুলোর ওপর দক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্পগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। কেননা, ভাষা শুধু সংস্কৃতি নয়, ভাষা হলো দর–কষাকষির ক্ষমতা।
আমাদের বর্তমান অবস্থান
এই স্পষ্ট চাহিদা সত্ত্বেও, বাংলা ও ইংরেজির বাইরে ভাষাশিক্ষার আমাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডিত। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার পদ্ধতি এবং সরঞ্জামের অপ্রতুলতার বিষয়টিও সবাই জানেন। আর স্কুল–কলেজে তৃতীয় ভাষা শেখার কোনো অপশনই নেই। ভাষাবিজ্ঞানীরা একমত, দ্বিতীয় একটা ভাষায় দক্ষ হতে হলে যত কম বয়সে সেই ভাষার ধ্বনি, শব্দ, বাক্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়, অর্থাৎ বনিয়াদি শিক্ষা নেওয়া যায়, ততই কার্যকর হয় (হাকুতা, বিয়ালিস্টক ও ওয়াইলি, ২০০৩)। কিন্তু ভাষাশিক্ষাকে সর্বদা ব্যবহার ঘনিষ্ঠ রাখতে হয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মনে গণিত ও ইংরেজি একই কাতারে স্থান পেয়েছে। কেননা, দুটিই ব্যবহার বিচ্ছিন্ন ভাষা হিসেবে শেখানো হয়ে আসছে। তদুপরি গণিত হচ্ছে বিমূর্ত ভাষা, কিন্তু ইংরেজি হলো মূর্ত ভাষা। সমাজে মূর্ত ভাষার ব্যবহার বা প্রয়োগ হয় প্রত্যক্ষভাবে। অন্যদিকে বিমূর্ত ভাষার প্রয়োগ হয় পরোক্ষে। আমাদের শিক্ষা গ্রহণের সংস্কৃতিতে এই ভেদটি করা হয় না। বহু দশক ধরে ইংরেজিকেও গণিতের মতোই একটি বিমূর্ত বিষয় হিসেবে অধ্যয়ন করে আসছে বাংলাদেশের সর্বজনীন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি ভাষা কোর্সগুলো প্রায়ই ঐচ্ছিক, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং স্পষ্ট কর্মপথ থেকে বিচ্ছিন্ন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অন্য ভাষা তো জানেনই না, যা–ও ইংরেজিটা আধাবিধি জেনে আসেন, সেটারও কার্যকর বিকাশ ঘটে না বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে। ফলে পাস করে বেরিয়ে চাকরির বাজারে দুর্বল হয়ে পড়েন। অন্যদিকে যারা কলেজে যেতে পারে না, প্রাথমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয়ের বিবিধ পর্যায় থেকে ঝরে পড়ে, তাদের অবস্থা তো ভীষণ নাজুক। এদের একটা অংশ ভোকেশনাল স্কুলে যায়, যেখানে ভোকেশন অনুযায়ী কোনো একটি বিদেশি ভাষা শেখা আবশ্যক হয়ে উঠতে পারে। সেখানে সেই ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা নেই। আবার শ্রমিকদের জন্য বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ যেখানে আছে, সেখানে সংখ্যা চাহিদার তুলনায় ক্ষুদ্র। উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক এক বছরে প্রায় ১৩ লাখ শ্রমিক বিদেশ গেছেন (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৪)। তাদের মধ্যে সরকারি কেন্দ্রে জাপানি, কোরিয়ান, ইংরেজি বা চীনা শিখেছেন আনুমানিক আড়াই হাজার, যা অনুপাতে খুবই নগণ্য। পূর্ব এশীয় ভাষার জন্য মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, মধ্যপ্রাচ্য আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রম গন্তব্য সত্ত্বেও সংগঠিত আরবি কোর্সের অভাব রয়েছে। সংক্ষেপে, আমাদের মানুষ দক্ষ হাত নিয়ে বিশ্ব ঘুরলেও জিব বাঁধা, যা রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে দিচ্ছে (জাগো নিউজ২৪, ২০২৫)।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা
যেকোনো অবকাঠমোগত পরিবর্তন করতে প্রথমে মানসিকতা পরিবর্তন করতে হয়। ভাষাশিক্ষাকে একটি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি বা ঐচ্ছিক বিষয় করে ভাবার যেমন বিপদ আছে, আবার আরেকটা বিপদ হলো কেবল অবস্থাপন্নদের জন্য ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা। এতে সমাজে বৈষম্য তৈরির পথগুলো আরও জোরালো হয়। সেই সঙ্গে এই মনোভাবটিও বিপদের যে ‘ইংরেজি জানলেই যথেষ্ট’ কিংবা ‘ইংরেজিকে কেবল ক্লাসরুমেই ব্যবহার করতে হবে। সমাজে এর ব্যবহার বাংলা ভাষার প্রতি অসম্মান দেখানো।’ এসব মনোভাব থেকে বের হয় কর্মমুখী বিদেশি ভাষাশিক্ষার সুযোগ সর্বজনীন করতে হবে। এসব মনোভাব আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে বিশ্বের জনশক্তিগুলোর স্বার্থের বিপরীতে কাজ করে। এটা শুধু পলিসি স্তরেই নয়, ভাষাবিজ্ঞানীরা একমত যে ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এসব মনোভাব নেতিবাচক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে (ওয়্যাং ও য়ু, ২০২০)।
সহজ কথায়, সামাজিক দ্বিধা কাটিয়ে শিক্ষার্থীকে ইতিবাচক মনোভঙ্গি নিয়ে ভাষা শিখতে হবে। সে ক্ষেত্রে দরকার সর্বজনীন শিক্ষার সঙ্গে বিদেশি ভাষাশিক্ষাকে আবশ্যিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। অর্থাৎ এটা রাষ্ট্রের বিধানে বিধি আকারে নিয়ে আসা। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আইনসমূহের একটি হচ্ছে শিক্ষা আইন। এ আইনের টাইটেল ৬ অনুসারে অন্য আরও খাতের সঙ্গে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের জন্য কাজের ভাষাগুলো শিক্ষাখাতে বরাদ্দের ব্যবস্থা আছে (ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন)। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা আইনের টাইটেল ৬–এর মাধ্যমে আসা সেই বরাদ্দ জাতীয় বিদেশি ভাষাসম্পদ কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষাসম্পদ কেন্দ্রগুলোর কল্যাণে আমেরিকার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষা যেমন আরবি, চীনা, রুশ, হিন্দি-উর্দু, বাংলা, তুর্কি, কোরীয়, স্প্যানিশ, জার্মান ইত্যাদির শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে ব্যয় হয় (এনএফএলআরসি)। এগুলো কেবল নিরাপত্তা ও কূটনীতিই নয়; বরং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। কেবল আমেরিকাই নয়, সিঙ্গাপুর থেকে নর্ডিক দেশগুলো পর্যন্ত সব উন্নত দেশ বহুভাষিক শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য, সাংস্কৃতিকভাবে এগিয়ে থাকার জন্য। আমেরিকার মডেলটি আমি আমার লেখায় উল্লেখ করছি এই কারণে যে আমি পেশাগতভাবে এই মডেলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। কিন্তু ইউরোপীয় মডেলও একই উদ্দেশ্য হাসিল করে। আমরা যদি একটি উদীয়মান অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে গুরুত্ব পেতে চাই, তাহলে আমাদের নীতি এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
জাতীয় ভাষাসম্পদ কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স সেন্টার (এনএফএলআরসি) পরিচালিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শাখা থাকে সেগুলো বিভিন্ন ভাষা শেখা ও শেখানো বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ এনএফএলআরসি এশিয়া-প্যাসিফিক যেমন চীনা, জাপানি, কোরিয়ানের জন্য প্রকল্পভিত্তিক লার্নিং মডিউল, অনলাইন টুলস এবং আন্তসাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ তৈরি করে। অন্যরা দক্ষতা পরীক্ষা (এইএলআরসি), ঐতিহ্য উপকরণ (এনএইচএলআরসি), আফ্রিকান/মধ্য এশীয় রিসোর্স (এনএএলআরসি/সিইএলসিএআর) এবং শিক্ষক ওয়ার্কশপ তৈরি করে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের এনএফএলআরসি এবং ইন্ডিয়ানার এনএএলআরসি-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভাষা সম্পদ কেন্দ্রগুলো শিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়ে গবেষণা, উপকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, গ্রীষ্মকালীন ইনস্টিটিউট এবং কে–১২/কলেজ রিসোর্সের মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় প্রতিযোগিতা বাড়ায়। অনেক কেন্দ্র তাদের গবেষণালব্ধ পণ্যগুলো অনলাইনের মাধ্যমে বিনা মূল্যে ছড়িয়ে দেয়, যা সারা দেশের ভাষা শিক্ষকদের উপকৃত করে। তা ছাড়া ওই সংস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ভাষা সম্পদ সেন্টারগুলোর জন্য একটি কার্যকর কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে দিশা ও দক্ষিণা প্রদান করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশেও একটি জাতীয় বিদেশি ভাষা রিসোর্স সেন্টার (এনএফএলআরসি) স্থাপন করা যেতে পারে। এই কেন্দ্র বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করবে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগগুলো, বাংলা একাডেমি, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়ের ওপর গবেষণাকর্মকে উৎসাহিত করবে, অনুপ্রাণিত করবে। শ্রম, শিল্পসংস্কৃতি ও পররাষ্ট্রসহ সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করবে বহুভাষী দক্ষশক্তি চাহিদার চিত্র বোঝার জন্য। জাতীয় শিক্ষা বোর্ড এবং উচ্চশিক্ষা কমিশনের সঙ্গে কাজ করবে ভাষাশিক্ষা কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রগুলোকে সমর্থন জোগাবে ভাষাশিক্ষাকে নিচের স্তরে বাস্তবায়ন করার জন্য, নতুন প্রজন্মের ভাষা শিক্ষক তৈরি করার জন্য, এবং দক্ষতা স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করার জন্য। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যোগাযোগকেন্দ্রিক কারিকুলাম/অ্যাপস ডিজাইন করবে এবং জাতীয় পোর্টালে বিনা মূল্যে শেয়ার করবে।
পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাসম্পদ কেন্দ্র
কিছু কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাকেন্দ্র আছে, যারা একাডেমিক কারিকুলামের বাইরে বিভিন্ন মেয়াদে ভাষাশিক্ষার কোর্স অফার করে। উৎসাহী এবং সামর্থ্যবান শিক্ষার্থীরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সেই কোর্সগুলো করেন। কিন্তু এতে নানা রকম খামতি আছে। প্রথমত, খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী এই সুবিধা গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়ত, এই কোর্সগুলোর মান ধারাবাহিকভাবে যাচাই হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স মূল্যায়ন কমিটি কিংবা শিক্ষা নীতি কমিটি এই কোর্সগুলোর চাহিদা, সক্ষমতা ইত্যাদি যাচাই করে না। আবার বিশ্বের ভাষাশিক্ষার পদ্ধতি ও মান মূল্যায়নকারী দুটি সংস্থা বেশ পরিচিত, একটি এসিটিএফএল (আমেরিকান) অন্যটি সিইএফএফ (ইউরোপীয়)। এদের যে স্তর বিভাজন, তথা এলিমেন্টারি এক বছর, ইন্টারমেডিয়েট এক বছর এবং অ্যাডভান্সড এক বছর অর্থাৎ এই তিন বছরের ভাষাশিক্ষার যে চাহিদা, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাকেন্দ্রগুলোর ভাষাশিক্ষা কোর্সগুলো তা সমন্বয় করতে পারে না।
এসব খামতি কাটানোর উপায় হচ্ছে ভাষাশিক্ষা কোর্সগুলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কোর্স করে নেওয়া, ডিগ্রির শর্তপূরণের অংশ করে তোলা, যেমন কোনো একটি বিদেশি ভাষায় ইন্টারমিডিয়েট লেভেল পার করতে হবে। সেমিস্টারভিত্তিক কোর্স তৈরি করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্বারা যাচাই করা এবং নিয়োগ করা প্রশিক্ষক দিয়ে এই কোর্সগুলো পরিচালনা করা। এর ফলে সব শিক্ষার্থী তাঁর সেমিস্টার ফির মধ্যেই এই কোর্সগুলো করতে পারবেন, বাড়তি টাকা দেওয়া লাগবে না। পাশাপাশি ভাষাকেন্দ্রগুলো হয়ে উঠবে ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও নানা রকম সহায়তা প্রদানের কেন্দ্র। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যতগুলো ভাষাশিক্ষার কোর্স অফার করা হয়, সেগুলো বিভাগ ও অনুষদ দিয়ে পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু এর কার্যনির্বাহী ভূমিকায় থাকতে পারে একটি ভাষাসম্পদ কেন্দ্র। এই কেন্দ্র বিভাগ এবং অনুষদের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে সর্ববিষয়ে, যেমন শিক্ষক নিয়োগ, পেশাগত উন্নতি, কর্মশালা, কোর্স প্রণয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে নতুন প্রজন্মের ভাষা শিক্ষক, অনুবাদ, দোভাষী তৈরি করা অবধি। একটি সাধারণ ভাষাকেন্দ্র আর কী কী সেবা দিতে পারে, তার একটি গড় চিত্র নিচে দেওয়া হলো।
· ভাষাশিক্ষা কোর্স বিনিময় কর্মসূচি
এটা ঠিক যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব সময় রাষ্ট্র কর্তৃক বিবেচিত ক্রিটিক্যাল ভাষাগুলো সব লেভেলে অফার করতে পারবে না। কখনো বাজেটে কুলাবে না, কখনো শিক্ষক পাওয়া যাবে না, কখনো উৎসাহী শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভাষাশিক্ষার কোর্স শেয়ারিং কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। কর্নেল, কলাম্বিয়া ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেয়ারড কোর্স ইনিশিয়েটিভ এমনই একটি কনসোর্টিয়াম, যা হাই ডেফিনিশন ভিডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্ট ক্লাসরুমে ভাষাশিক্ষার ক্লাস শেয়ার করে (সিইউএলআরসি)। সেসব ক্লাসরুমে বড় পর্দায় অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হাজির থাকে। স্মার্ট ব্ল্যাকবোর্ড/হোয়াইট বোর্ডের কর্মকাণ্ড ভিন্ন একটি পর্দায় দেখা যায়। ফলে তিনটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মিলে একটি বড় ক্লাস তৈরি হয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের ভাষা অনুশীলনের কমিউনিটির আকারও বৃদ্ধি পায়। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সব ভাষার জন্য শিক্ষক নিয়োগ করা লাগে না।
· বিষয়ভিত্তিক ভাষাশিক্ষা কার্যক্রম
একটা সাধারণ প্রশ্ন ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে উঠে আসে, তা হলো দু–তিন বছর একটি বিদেশি ভাষা শিখে কি সেই ভাষায় বিষয়গত ব্যুৎপত্তি লাভ করা যায়? প্রশ্নটি বেশ যুক্তিযুক্ত, কেননা শিক্ষার্থীর সক্ষমতাভেদে কেউ তা পারলেও গড়ে সেটা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কোর্সগুলোর সঙ্গে অন্তত ১–ক্রেডিটের একটি ভিন্ন ভাষার ডিসকাশন কোর্স জুড়ে দেওয়ার কর্মসূচি ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করছে (সিএলএসিসি; সিইউএলআরসি)। যেমন ইংরজি ভাষায় নেওয়া ৩-ক্রেডিটের একটি অর্থনীতির কোর্সের সঙ্গে একটি ১-ক্রেডিটের স্প্যানিশ, চায়নিজ, কোরিয়ান, কিংবা হিন্দি ডিসকাশন সেকশন জুড়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সেখানে ওই অর্থনীতি কোর্সের আলোচ্য বিষয়ই আবার আলোচনা করেন, কিন্তু এবার ইংরেজিতে না, বরং ভিন্ন একটি ভাষায়। সেই সেকশন পরিচালনা করেন ওই অর্থনীতি ক্লাসের বা বিভাগের একজন টিএ, যে সেকশনে ব্যবহারিত ভাষাটিতে দক্ষ। এভাবে ইন্টারমিডিয়েট এবং অ্যাডভান্সড লেভেলের ভাষা শিক্ষার্থীরা সুযোগ পান তাঁদের শেখা ভাষায় বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করার, সঙ্গে ক্রেডিটও পান।
· স্টাডি-অ্যাব্রড ও ভাষাশিক্ষা শর্ট কোর্স
ভাষাশিক্ষার শর্ট কোর্স স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভোকেশনাল বা কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব জায়গাতেই প্রয়োজন। এটা প্রয়োজনভিত্তিক এবং তাৎক্ষণিক আয়োজন। তবে এটা স্কুল–কলেজে নিয়মিত করা যেতে পারে। এ ধরনের ভাষাশিক্ষা কোর্স যেমন স্টাডি-অ্যাব্রড প্রকল্পকে সহায়তা করে, তেমনি বিদেশে কাজ করতে গেলেও এ ধরনের কোর্স কাজে লাগে। সর্বোপরি এটা হলো ভাষার সঙ্গে বনিয়াদি পরিচয়মূলক কোর্স, যা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি বা নিয়মিত সেমিস্টারভিত্তিক ভাষাশিক্ষা কোর্সের জন্য আগাম শিক্ষার্থী তৈরি করে। বাস্তবতার নিরিখে যেসব ভাষা ক্রিটিক্যাল এবং বর্তমান প্রেক্ষিতেই আয়োজন সম্ভব, সেগুলার জন্য কোর্স স্কুলেই শুরু করা যায়। যেমন আধুনিক আরবি, হিন্দি-উর্দু ও ইংরেজি। ভোকেশনাল স্কুলগুলোতে ভোকেশন অনুযায়ী যেসব দেশের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক তৈরি হবে, সেসব দেশের ভাষার ওপর কোর্স থাকবে, যেমন ইংরেজি, ম্যান্ডারিন, জাপানিজ, কোরিয়ান, হিন্দি-উর্দু এবং স্প্যানিশ ইত্যাদি।
উল্লিখিত বিদ্যায়তনিক ভাষাশিক্ষার কোর্সগুলো পরিচালনা করতে পারে ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র। এর পাশাপাশি নন-একাডেমিক প্রকল্পও পরিচালনা করতে পারে সেই কেন্দ্র। যেমন ভাষাশিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা অনুশীলনের জায়গা এবং দরকারি সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস কিংবা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে এই আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে কেবল ভাষা শেখার বিষয়টাকে কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যেমন অনুবাদক ও দোভাষী তৈরিতে ভাষাসম্পদ কেন্দ্রগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে সরকারি–বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
ভাষার অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার আন্দোলন
বায়ান্নতে পূর্ববঙ্গের মানুষ লড়াই করেছেন বাঙালির প্রথম ভাষা (মাতৃভাষা) এবং একই সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের সাধারণ ভাষা (লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। এক পিঠে সেটা ছিল গণতান্ত্রিক বিবেচনায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রাম, অন্য পিঠে লড়াইটা ছিল ভাষার অর্থনীতিতে পূর্ব বাংলার জনগণকে যারা বঞ্চিত করতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই। আজ বিদেশগামী শ্রমিকদের মর্যাদা ও পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্য, দেশি উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের ব্যবসার প্রতিযোগিতায় সম্মান ও লাভজনক অবস্থান পাওয়ার জন্য এবং একাডেমিকদের জ্ঞান আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে, কূটনীতিকদের অধিকতর অ্যাকসেস নিশ্চিত করার জন্য ‘দ্বিতীয় ভাষা’ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সময়। কাজের জন্য দ্বিতীয় একটি ভাষা পেশাগত স্তরে ব্যবহার জন্য শিখলে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত বিকাশ হবে, কর্মজীবন ও জীবনের সুযোগের বিস্তৃতি ঘটবে, অন্য মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরতর বোঝাপড়া তৈরি হবে। পরিশেষে বলা দরকার, গুরুত্বপূর্ণ ভাষাশিক্ষা ভিড়ের কারিকুলামে অতিরিক্ত বোঝা নয়। এটি পররাষ্ট্রনীতি, শ্রমনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনৈতিক নীতি এবং সাংস্কৃতিক নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি করা কারিকুলাম জাতিকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট।। U.S. Department of State, (n.d.), ‘Critical Language Scholarship (CLS) Program’।
ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪।। Dhaka Tribune, ‘Lack of language skills hinders fair wages in Gulf jobs’, March ১৬।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২১।। The Business Standard, ‘Bangladesh’s per worker remittance one of the lowest’, February 7।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।। The Business Standard, ‘Bangladeshi workers to reap benefits as Saudi job market expands’, January 9।
নায়েক ২০২৪।। Naik, P. R., ‘English in Bangladesh - 6 years later!’, The Daily Star, June 21।
হোসাইন ও রহমান ২০২৩।। Hossain, S., & Rahman, T., ‘What's so great about English education anyway?’, The Daily Star, January 11।
ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪।। Dhaka Tribune, ‘Lack of language skills hinders fair wages in Gulf jobs’, March 16।
বিএইচআরআরসি ২০২৪।। Business & Human Rights Resource Centre, ‘Bangladesh: Non-Arabic speakers migrating to the Gulf receiving lower salaries’, March 15।
ইউরোপীয় কমিশন ২০০৬।। European Commission, ‘ELAN: Effects on the European economy of shortages of foreign language skills in industry & commerce।
হাকুতা, বিয়ালিমস্টোক ও ওয়াইলি ২০০৩।। Hakuta, K., Bialystok, E., & Wiley, E., ‘Critical evidence: A test of the critical-period hypothesis for second-language acquisition’, Psychological science, 14(1), 31-38।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪।। The Business Standard, ‘Labour migration hits record 13 lakh in 2023’, January 2।
জাগো নিউজ২৪ ২০২৫।। ‘মধ্যপ্রাচ্যে ভাষা না জানার খেসারত দিচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরা’, ডিসেম্বর ১৮।
ওয়্যাং ও য়ু ২০২০।। Wang, L., & Wu, X., ‘Influence of affective factors on learning ability in second language acquisition’, Revista Argentina de Clínica Psicológica, 29(2), 1232।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন।। U.S. Department of Education, Office for Civil Rights. (n.d.). Education and Title VI ।
এনএফএলআরসি।। National Foreign Language Resource Centers. (n.d.). Language Resource Center funding history 1990-2026 ।
সিইউএলআরসি।। Columbia University Language Resource Center. (n.d.). Shared Course Initiative ।
সিএলএসিসি।। Cultures & Languages Across the Curriculum Consortium. (n.d.). Home ।
সিইউএলআরসি।। Cornell University Language Resource Center. (n.d.). Languages Across the Curriculum ।
https://lrc.cornell.edu/languages-across-curriculum
লেখক পরিচিতি
ড. আহমেদ শামীম যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স সেন্টারে (এলআরসি) একাডেমিক প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত আছেন। এই দায়িত্বে তিনি এলআরসির বিভিন্ন একাডেমিক ভাষাবিষয়ক উদ্যোগ সমন্বয় ও মূল্যায়ন করেন, যার মধ্যে রয়েছে শেয়ারড কোর্স ইনিশিয়েটিভ, ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাক্রস দ্য কারিকুলাম এবং জাম্পস্টার্ট। এলআরসি-তে যোগদানের আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিস্টার এবং সামার প্রোগ্রামগুলোতে বাংলা পড়িয়েছেন। শামীম ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণার আগ্রহের জায়গাগুলো হলো ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতি, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব এবং ব্যাকরণ।