কৃষিতে নারী: একটি দৃশ্যমান বিপ্লব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

· Prothom Alo

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন হলো কৃষি। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস এই খাত, যা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ অবদান রাখছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কৃষিতে যে নীরব অথচ শক্তিশালী পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, তা হলো কৃষিশক্তির ‘নারীকরণ’ (ফেমিনিজেশন অব অ্যাগ্রিকালচার)। আমাদের লোকজ সংস্কৃতিতে কৃষিকাজকে ঐতিহাসিকভাবে পুরুষের কাজ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

Visit h-doctor.club for more information.

পরিসংখ্যানে নারীর জয়যাত্রা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩) অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী নারীদের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। এর বিপরীতে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ১৮ দশমিক ৮২ শতাংশ (বাংলাদেশ স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়াবুক, ২০২৪)। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের কৃষিতে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাধিক্য স্পষ্ট। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, নারীরা এখন আর কেবল শ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী কাজ, যেমন মাড়াই, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনেও তাঁরা অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করছেন। প্রকৃতপক্ষে নারীশ্রম ছাড়া কৃষকের ঘরে ফসলের যথাযথ সংরক্ষণ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আজ প্রায় অসম্ভব।

কৃষির নারীকরণের নেপথ্যে

গত এক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ পুরুষেরা ক্রমবর্ধমান হারে শহরমুখী হচ্ছে, অথবা প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। পুরুষের এই অভিবাসনের ফলে গ্রামের কৃষি ব্যবস্থাপনার গুরুভার এসে পড়েছে নারীর কাঁধে। বিশেষ করে গবাদিপশু পালন, পোলট্রি খামার পরিচালনা, বীজ সংরক্ষণ ও সবজি চাষে নারীরা এখন নেতৃত্বের আসনে। দেখা গেছে, প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রামীণ নারী স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণের কাজ করেন, যা কৃষির জীববৈচিত্র্য ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করছে। এ ছাড়া মাছ শুকানো, চিড়া-মুড়ি তৈরি এবং বিভিন্ন ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তারা পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করছে।

বাধা যেখানে পাহাড়সম: জমির মালিকানা ও অর্থায়ন

কৃষিতে নারীর এই বিশাল অংশগ্রহণ থাকলেও তাঁরা নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এর মধ্যে প্রধান হলো জমির মালিকানা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাত্র ১৩ শতাংশ নারী একক বা যৌথভাবে কৃষিজমির মালিক, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশ। জমির মালিকানা না থাকায় নারীরা সামাজিকভাবে ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি পান না, বরং ‘সহযোগী’ হিসেবে বিবেচিত হন।

এই মালিকানা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি অর্থায়নে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জামানত হিসেবে জমির দলিল দাবি করে। ফলে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টের (আইএফএডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণ নারীরা পুরুষের তুলনায় ২০ শতাংশ কম আনুষ্ঠানিক ঋণসুবিধা পান। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে তাঁরা আধুনিক কৃষি উপকরণ বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না, যা তাঁদের উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করে।

প্রযুক্তির ছোঁয়া ও নারীর অংশগ্রহণ

উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার অপরিহার্য। তবে লিঙ্গবৈষম্য ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারীই নতুন প্রযুক্তির সুফল পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) একটি প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ৩০ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি প্রশিক্ষণ পান, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশের বেশি। তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নারীবান্ধব প্রযুক্তি গ্রামীণ জীবন বদলে দিচ্ছে। যেমন—

ফডার চপার: এটি গবাদিপশুর ঘাস কাটার কাজ সহজ করে নারীর শারীরিক শ্রম কমিয়েছে।

হারমেটিক স্টোরেজ ব্যাগ: বীজ সংরক্ষণে পোকা ও আর্দ্রতা রোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

বিএইউ-এসটিআর ড্রায়ার: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত এই ড্রায়ার শস্য শুকানোর অপচয় ৩-৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

যান্ত্রিক মাড়াই: ধান, গম ও ভুট্টা মাড়াইয়ের যান্ত্রিকীকরণ নারীদের দলগতভাবে সেবা প্রদানকারী (সার্ভিস প্রোভাইডার) হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।

কৃষি শিক্ষা ও আগামীর সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বর্তমানে ঈর্ষণীয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করছেন। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে ৩০ শতাংশ এবং কৃষি গবেষণায় ১২ শতাংশ নারী যুক্ত আছেন। এই বিশাল দক্ষ জনশক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে কৃষির লাভজনকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এখন ‘কৃষক ক্লাব’ ও ‘ফার্ম স্কুল’ গঠনে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে, যা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আমাদের করণীয়

কৃষিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

১. আইনি সংস্কার: নারী যাতে জমি ও সম্পত্তিতে সমান অধিকার পায়, সে জন্য আইনি সংস্কার ও ‘যৌথ মালিকানা’ মডেলকে উৎসাহিত করতে হবে। জমির দলিলে নারীর নাম থাকলে তাঁরা সহজে ব্যাংকঋণ ও সরকারি প্রণোদনা পাবেন।

২. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: বাংলাদেশ ব্যাংককে নারীবান্ধব ব্যাংকিং নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ ও নমনীয় কিস্তির সুবিধা থাকবে।

৩. প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ: কৃষি প্রশিক্ষণের সময়সূচি ও স্থান নারীর সুবিধামতো নির্ধারণ করতে হবে। অধিকসংখ্যক নারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে নারী কৃষকদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছানো সহজ হবে।

৪. উদ্যোক্তা তৈরি: ক্ষুদ্র পরিসরে দুগ্ধজাত পণ্য, আচার বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরিতে নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বাজার সংযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর ভূমিকা এখন আর কেবল পর্দার আড়ালের গল্প নয়, এটি একটি দৃশ্যমান বিপ্লব। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এই বিশাল কর্মিবাহিনীকে অবহেলার সুযোগ নেই। অনুকূল জননীতি, যান্ত্রিকীকরণ ও গবেষণার সঙ্গে নারীর এই শ্রমকে সমন্বয় করতে পারলে বাংলাদেশ কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই থাকবে না, বরং বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও শীর্ষস্থানে পৌঁছাবে। নারীর হাতেই হোক আগামীর সমৃদ্ধ কৃষি।

  • ড. সুস্মিতা দাস পরিচালক, কৃষি তথ্যকেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

Read full story at source