‘আমার দেওয়া পবিত্র বস্তু থেকে তোমরা খাও’

· Prothom Alo

একজন মুমিনের জন্য কেবল জীবন ধারণই যথেষ্ট নয়, বরং তার উপার্জনের প্রতিটি পয়সা হালাল হওয়া বাঞ্ছনীয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “আমি তোমাদের যেসব পবিত্র বস্তু (রিজিক হিসেবে) দান করেছি, তা থেকে তোমরা আহার করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৫৭)

Visit extonnews.click for more information.

এই তাইয়িবাত বা ‘পবিত্র বস্তু’ বলতে এমন রিজিককে বোঝানো হয়েছে, যা দৃশ্যত পবিত্র এবং যা উপার্জনের পদ্ধতিগত দিক থেকেও শরিয়তসম্মত।

রিজিক যদি হারাম হয়, তবে তার প্রভাব কেবল দুনিয়ার জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানুষের ইবাদত ও দোয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকল, সে নিজের ধর্ম ও ইজ্জত রক্ষা করল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়ে লিপ্ত হলো, সে যেন পশুর পালের রাখালের মতো সেই সংরক্ষিত চারণভূমির চারপাশ দিয়ে পশু চরাচ্ছে, যেখানে যেকোনো সময় পশুর ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৯)

যদি পিতার আয়ের প্রধান অংশ হালাল হয় এবং কিছু অংশ সুদের মতো হারামে লিপ্ত থাকে, তবে সন্তানের জন্য সেই অর্থ দিয়ে পড়াশোনা করা বা ভরণপোষণ গ্রহণ করা নাজায়েজ নয়।

হারাম মালের প্রকারভেদ

আলেম ও ফকিহরা হারাম মালের ব্যবহার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে হারাম মালকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন:

অসিয়ত: গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিধান

১. পুরোপুরি হারাম: যে ব্যক্তির সমস্ত উপার্জনই হারাম বা অবৈধ উৎস থেকে আসে। যেমন—এমন কেউ যার আয়ের উৎস কেবল সুদ, ঘুষ বা চুরির মতো অপরাধ। এমন ব্যক্তির বাড়িতে আহার করা বা তার সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন করা শরিয়তসম্মত নয়।

২. মিশ্র আয়: যে ব্যক্তির উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয়ই বিদ্যমান। এই শ্রেণির মানুষের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি মত পাওয়া যায়:

  • কেউ কেউ মনে করেন, যদি হালাল আয়ের পরিমাণ হারামের চেয়ে বেশি হয়, তবে তার সঙ্গে লেনদেন করা জায়েজ।

  • কারো মতে, যদি হারামের পাল্লা ভারী হয়, তবে তার থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

  • অন্য একদল আলেম একে ‘মাকরহে তানজিহি’ বা অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য করেছেন, যাতে মুমিন সন্দেহমুক্ত থাকতে পারে।

পিতার হারাম উপার্জনে সন্তানের অধিকার

পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে উপার্জনের মূল ব্যক্তি বা পিতা হারামে লিপ্ত থাকেন। এক্ষেত্রে সন্তানের করণীয় নিয়ে ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত:

মিশ্র আয়ের ক্ষেত্রে: যদি পিতার আয়ের প্রধান অংশ হালাল হয় এবং কিছু অংশ সুদের মতো হারামে লিপ্ত থাকে, তবে সন্তানের জন্য সেই অর্থ দিয়ে পড়াশোনা করা বা ভরণপোষণ গ্রহণ করা নাজায়েজ নয়। তবে সন্তান যদি নিজের আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে, তবে পিতার সেই সন্দেহযুক্ত অর্থ পরিহার করাই উত্তম

সম্পূর্ণ হারাম আয়ের ক্ষেত্রে: যদি পিতার সমস্ত উপার্জনই হারাম হয়, তবে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্য সেই অর্থ ভোগ করা বৈধ নয়। তবে যদি সন্তান অপ্রাপ্তবয়স্ক হয় কিংবা এমন অনন্যোপায় (জরুরি) অবস্থায় থাকে যে তার আয়ের কোনো বিকল্প উৎস নেই এবং জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে ‘জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধকে বৈধ করে’ নীতি অনুযায়ী সে ততটুকুই গ্রহণ করতে পারবে যা দিয়ে জীবন রক্ষা পায়।

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.), তাফসিরুল কুরআনিল আজিমনবী মুহাম্মদের উম্মতকেও তেমনই হালাল রিজিকের অনুসন্ধানে সচেষ্ট থাকতে বলা হয়েছে। কারণ হালাল খাবার অন্তরে নুর সৃষ্টি করে এবং সৎকাজের প্রেরণা দেয়।তাড়াহুড়োর মনস্তত্ত্ব: কোরআন কী বলে

পিতার সঙ্গে আচরণ

পিতা সুদের কারবারে লিপ্ত থাকলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তাঁকে ত্যাগ করার বিষয়ে ইসলাম কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। কেবল গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে পিতার অবাধ্য হওয়া বা তাঁকে ত্যাগ করা জায়েজ নয়। 

তবে যদি সন্তান মনে করে যে সাময়িকভাবে কথা বলা বন্ধ রাখলে বা কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলে পিতা এই গুনাহ থেকে ফিরে আসবেন, অর্থাৎ এটি সংশোধনের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়, তবে সীমিত সময়ের জন্য দূরত্ব বজায় রাখা যেতে পারে।

অন্যথায় নমনীয়তা ও আদবের সঙ্গে তাঁকে সংশোধনের দাওয়াত দিয়ে যেতে হবে।

শেষ কথা

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) সুরা বাকারার ৫৭ নম্বর আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, বনি ইসরাইলকে যেমন মান্না ও সালওয়া নামক পবিত্র খাবার দেওয়া হয়েছিল, নবী মুহাম্মদের উম্মতকেও তেমনই হালাল রিজিকের অনুসন্ধানে সচেষ্ট থাকতে বলা হয়েছে। কারণ হালাল খাবার অন্তরে নুর সৃষ্টি করে এবং সৎকাজের প্রেরণা দেয়। (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৫০, দারু তৈয়্যিবাহ, ১৯৯৯)

ইমাম নববী (রহ.) তাঁর লিখেছেন, তাকওয়া বা আল্লাহভীতির দাবি হলো যেকোনো সন্দেহজনক বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। কারণ হৃদয়ের প্রশান্তি কেবল স্বচ্ছ ও পবিত্র রিজিকের মাধ্যমেই অর্জিত হওয়া সম্ভব। (শারহু সহিহ মুসলিম, ১১/২৭, দারু ইহয়াইত তুরাসিল আরাবি, ১৯৭২)

ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হালাল খাবার

Read full story at source