‘কালরাত্রি’র অকাট্য দলিল, ইতিহাসের নেপথ্য চরিত্র
· Prothom Alo

একাত্তরের মার্চে রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানি বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত গোপনে চরম সামরিক শক্তি প্রয়োগের যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তার প্রাথমিক রূপরেখাটি তৈরি করা হয়েছিল অনেক আগেই। পূর্ব পাকিস্তানে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অস্থিতিশীলতা দমনের জন্য তৎকালীন ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ‘অপারেশন ব্লিটজ’ নামে একটি আপৎকালীন সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসেই। কিন্তু তিনি দ্রুতই উপলব্ধি করেন যে এই গভীর রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কেবল সীমিত সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। সামরিক জান্তার নির্বিচার বলপ্রয়োগের নীতির সঙ্গে একমত হতে না পেরে তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ‘কঠোর’ ও ‘নির্মম’ হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।
১৫ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজাকে রাজনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেন। এরপর ১৬ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে ডেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য একটি সামরিক অভিযানের খসড়া বা কন্টিনজেন্সি প্ল্যান প্রস্তুত করার সরাসরি নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের ভিত্তিতে ১৭ মার্চ এই দুই জেনারেল একত্র হয়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মূল কাজ শুরু করেন।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
‘সনি টিআর-১০০০’ মডেলের ট্রানজিস্টর রেডিওপরিকল্পনার কাজ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়। রাও ফরমান আলী রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়নটি লেখেন এবং খাদিম হুসেন রাজা মাঠপর্যায়ের সৈন্যদের দায়িত্বের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করেন। ১৯ মার্চ এই পরিকল্পনা ঊর্ধ্বতন জেনারেলদের কাছে পেশ করা হয়। এই সামরিক পরিকল্পনার মূল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, প্রদেশের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করা। তবে সামরিক ক্র্যাকডাউনের তাৎক্ষণিক প্রধান লক্ষ্যগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহ। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৬টি ব্যাটালিয়ন, ৩০ হাজার সদস্যের ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এবং পুলিশ বাহিনীর সব বাঙালি সদস্যকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করা। সামরিক জান্তা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে এই সশস্ত্র বাঙালি ইউনিটগুলো যেকোনো সময় বিদ্রোহ করতে পারে। পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সব কটি বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম নৌঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সব যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াও ছিল এ অভিযানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিকল্পনাটি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন।
ড. হোসেনের মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। রাতের আঁধারে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো নিশ্চয়ই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তাঁর কাছে ‘সনি টিআর-১০০০’ মডেলের একটা ট্রানজিস্টর রেডিও ছিল। ফ্রিকোয়েন্সি ঘোরাতেই তিনি বিভিন্ন ইউনিটের কথোপকথন ধরতে পারলেন।
২৪ ও ২৫ মার্চের দিকে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে ও ভীতিকর রূপ ধারণ করে। শহরের বিভিন্ন স্থানে—বিশেষ করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে—সাধারণ বাঙালিরা গাছের গুঁড়ি, বাতিল যানবাহন এবং ইটের গাঁথুনি দিয়ে অসংখ্য ব্যারিকেড বা অবরোধ তৈরি করতে শুরু করে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অত্যন্ত গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচির উদ্দেশে রওনা হন। তিনি নির্দেশ দিয়ে যান, তাঁর বিমান করাচি পৌঁছানোর পরই যেন এই সামরিক অভিযান শুরু হয়। কিন্তু রাস্তায় বাঙালিদের অসংখ্য ব্যারিকেড দেখার পর ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেলরা আর দেরি করতে চাননি। তাঁরা পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই—অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকেই—তাদের সাঁজোয়া বহর ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়েন।
দুই
২৫ মার্চ মধ্যরাতের দিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসা মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর বিকট বিস্ফোরণে আচমকাই ঢাকা আণবিক শক্তিকেন্দ্রের তৎকালীন পদার্থবিদ ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেনের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই সবচেয়ে আগে তাঁর মনে হলো, যা ঘটার তা শুরু হয়ে গেছে। ততক্ষণে খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার সেই বাড়ির সবারই ঘুম ভেঙে গেছে। বাইরে ঠিক কী ঘটছে, তা বোঝার জন্য তিনি ছাদে গেলেন। ১৯৭১ সালের ঢাকা শহরে এত উঁচু উঁচু দালানকোঠা ছিল না। শহরজুড়ে প্রচুর ফাঁকা জায়গা থাকায় শহরের চারদিক থেকেই ভারী গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানিরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যেই গোলাগুলি থেমে গেল এবং ব্যারাকগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আগুনের লেলিহান শিখা খিলগাঁওয়ের ছাদ থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ছাদ থেকে নিচে নেমে আসতেই ড. হোসেনের মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। রাতের আঁধারে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো নিশ্চয়ই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তাঁর কাছে ‘সনি টিআর-১০০০’ মডেলের একটা ট্রানজিস্টর রেডিও ছিল। ফ্রিকোয়েন্সি ঘোরাতে শুরু করতেই মুহূর্তের মধ্যে শর্টওয়েভে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কথোপকথন ধরতে পারলেন। বেশ কয়েকটি ইউনিট নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক বার্তা আদান-প্রদান করছিল। সেসব শুনে ঢাকা শহরের ভয়াবহ পরিস্থিতির একটা পরিষ্কার চিত্র তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনি উপলব্ধি করলেন, ইতিহাসের স্বার্থে এই কথোপকথনগুলো রেকর্ড করে রাখা দরকার। কালবিলম্ব না করে একটি কেব্লের মাধ্যমে রেডিও সেটটির সঙ্গে তিনি তাঁর ‘গ্রুন্ডিগ টিকে-২৪’ স্পুল টেপরেকর্ডারটি জুড়ে দিলেন। ইউরোপে উচ্চতর পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার সময় গান আর খবর শোনার শখ থেকে তিনি এই যন্ত্রগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। ২৬ মার্চ রাত দেড়টা থেকে শুরু করে সকাল নয়টা পর্যন্ত তিনি অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে কথোপকথনগুলো ধারণ করেন।
অপারেশন সার্চলাইট দিয়ে বাঙালিদের ওপর নৃশংস এক গণহত্যার সূচনা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, ২৫ মার্চ ১৯৭১রেকর্ডিং চলার ফাঁকে ফাঁকে ড. হোসেন এবং তাঁর পরিবার রুদ্ধশ্বাসে সেই কথোপকথনগুলো শুনছিলেন। কথোপকথনগুলো বিশ্লেষণ করলে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয়তার এক ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়। অপারেশন সার্চলাইটের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো—বিশেষ করে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল। ওয়্যারলেস বার্তা থেকে জানা যায়, এই ইউনিটটি শুরুতে জগন্নাথ এবং ইকবাল হল থেকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের বর্বরতার চরম রূপ প্রকাশ পায় হতাহতের পরিসংখ্যানে। ওয়্যারলেস কথোপকথনে যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হতাহতের সংখ্যা জানতে চাওয়া হয়, তখন এক ইউনিটটি জানায় যে প্রায় ৩০০ জন হতাহত হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন নিশ্চিত হতে চান যে এরা নিহত নাকি বন্দী। তখন ‘কল সাইন ৮৮’ অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে নিশ্চিত করে যে ৩০০ জনের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন যে এটিই সবচেয়ে সহজ উপায়। কারণ, এতে কাউকে কোনো প্রশ্ন করতে হবে না বা কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। নিজেদের এই চরম বর্বরতা আড়াল করতে ভোরের আলো ফোটার আগেই স্থানীয় লোকজন ব্যবহার করে সব মৃতদেহ এক জায়গায় জড়ো করে লোকচক্ষুর সামনে থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করার জন্যও তারা সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করে। কন্ট্রোল রুম থেকে একটি পর্যায়ে নিশ্চিত করা হয় যে তারা সফলভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। ওয়্যারলেসে এর বর্ণনা ছিল এ রকম যে তারা মূল পাখিকে খাঁচায় বন্দী করেছে। তবে তাজউদ্দীন আহমদের মতো নেতারা আগেই বিপদের আঁচ করতে পেরে অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন বলে তল্লাশি চালিয়েও তাঁদের পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে তাঁর বাড়িতেই হত্যা করা হয়। অত্যন্ত উল্লাসের সঙ্গে তারা ঘোষণা করে যে ডেইলিপিপল পত্রিকার কার্যালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ড. হোসেন রেকর্ডিং সম্পন্ন করার পর চুপ করে বসে থাকেননি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য তিনি এই তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এপ্রিলের কোনো এক সময়ে রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় লোক আণবিক শক্তিকেন্দ্রের বেশ কয়েকটি অফিসকক্ষ তছনছ করে, যার মধ্যে তাঁরটিও ছিল।
সাধারণ জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টির জন্য তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর কিছু নির্দেশ জারি করেছিল। শহরের কোথাও কোনো কালো পতাকা বা বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা গেলে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে এবং ভবনমালিককে এ জন্য দায়ী করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ওয়্যারলেসে নির্দেশ এল, অবিলম্বে চারদিক থেকে বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে, অন্যথা কঠোর শাস্তি। ড. হোসেন আর তাঁর পরিবার তখন পতাকাটি নামিয়ে ফেলে। রাস্তার ব্যারিকেড সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশ ছিল যে কাউকে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হবে এবং ব্যারিকেডের আশপাশের বাড়িঘর সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য কিছু মানুষকে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড বা ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ দিয়ে বাকিদের ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে কেউ আর প্রতিরোধ গড়ার সাহস না পায়। আটক বন্দীদের খাবার দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কন্ট্রোল রুম থেকে উত্তর দেওয়া হয় যে কিছুক্ষণ খাবার না দেখলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং বাঙালিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে যে অসহযোগ আন্দোলন করেছে, তাদের সঙ্গেও সেই একই নীতি প্রয়োগ করা হবে।
২৫ মার্চ রাত আর ২৬ মার্চ দিনভর নারকীয় তাণ্ডব চলার পর ২৭ মার্চ সকালে টানা কারফিউ শিথিল করা হলো। কারফিউ শিথিল হতেই ড. হোসেন তাঁর আত্মীয় মন্টুর মোটরবাইকে চড়ে আণবিক শক্তিকেন্দ্র অফিসে যান, সেখান থেকে ইকবাল হলে। ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ২৫ মার্চের রাতে হানাদার বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই হলটি। সেখানে তাঁরা রাস্তার পাশে ফুলে ওঠা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। স্টেডিয়াম এলাকায় মানুষজনকে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে দেখে পরিচিত এক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত হন যে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়েছে, যা তিনি রেকর্ডিংয়েও শুনেছিলেন।
খিলগাঁওয়ে বাড়িতে ফিরে ড. হোসেন দেখেন তাঁর সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. ওয়াজেদ মিয়া তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি নিজের, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর (শেখ হাসিনা) এবং স্ত্রীর এক আত্মীয়ের জন্য আশ্রয়ের অনুরোধ করলেন। ড. হোসেনের বাবা তাৎক্ষণিকভাবে সোজাসাপটা উত্তর দিলেন যে বন্ধু বিপদে পড়ে সাহায্য চেয়েছে, তাই সাধ্যমতো তা করা হবে। ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁদের নিয়ে আসার সময় ড. ওয়াজেদ তাড়াহুড়োয় গাড়ির চাবি ডিকির ভেতরে রেখেই আটকে দেন। মূল রাস্তার ওপর বাড়ি থাকায় জোরে শব্দ করা যাচ্ছিল না, অথচ কারফিউ শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল এবং খিলগাঁওয়ের বাড়িতে কোনো টেলিফোন ছিল না বলে, দেরি হলে, পরিবারের সবাই অমঙ্গলের আশঙ্কায় ভেঙে পড়ত। অনেক কসরতের পর চাবি বের করে কারফিউ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে তাঁরা খিলগাঁও পৌঁছান। সপ্তাহখানেক সেখানে তাঁরা অতিথি হিসেবে ছিলেন। সিঁড়ির নিচে ফাঁকা জায়গায় ওয়াজেদের গাড়িটি পার্ক করে রাখা হয়েছিল। বাড়িতে অনেক মানুষের ভিড় থাকলেও অন্য অতিথিরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কোনার বন্ধ ঘরে কারা আছেন, এমনকি প্রতিবেশী বিহারি পরিবারটিও কোনো অবাঞ্ছিত কৌতূহল দেখায়নি।
২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হওয়ার পর মানুষের এক অন্তহীন স্রোত খিলগাঁওয়ে তাঁদের বাড়ির সামনে দিয়ে পায়ে হেঁটে বাড্ডা বিল, বালু নদ এবং শীতলক্ষ্যা পার হয়ে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। শুরুতে দরিদ্র ভাসমান শ্রেণির মানুষ ঢাকা ছাড়লেও ধীরে ধীরে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও প্রাণভয়ে পালাতে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা এক জনমানবশূন্য ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়।
২৯ বা ৩০ মার্চের দিকে ড. হোসেন রমনা কালীবাড়ি মন্দিরে যান, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা ২৫ মার্চের রাতে ভেতরের সবাইকে হত্যা করেছিল। মন্দিরের দৃশ্য ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক নরককুণ্ডের মতো। চারদিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ফুলেফেঁপে ওঠা লাশগুলো থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল। কাক আর কুকুরেরা সেই লাশগুলো খুবলে খাচ্ছিল। তিনি একনজর দেখেই দ্রুত বেরিয়ে আসেন। ঠিক তখনই পাকিস্তানি সেনাদের বহনকারী একটি জিপ ভেতরে ঢোকে। কয়েক সপ্তাহ পর মন্দির কমপ্লেক্সটি ভেঙে ফেলা হয়। মন্দিরের ইট দিয়ে খিলগাঁওয়ের রাস্তাও মেরামত করা হয় বলে তাঁর মনে হয়েছিল।
ড. হোসেন রেকর্ডিং সম্পন্ন করার পর চুপ করে বসে থাকেননি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য তিনি এই তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এপ্রিলের কোনো এক সময়ে রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় লোক আণবিক শক্তিকেন্দ্রের বেশ কয়েকটি অফিসকক্ষ তছনছ করে, যার মধ্যে তাঁরটিও ছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি টেপটি কয়েক দিন বাড়িতে এবং কয়েক দিন অফিসে রাখতেন। ওই রাতে টেপটি অফিসে না থাকায় তিনি এবং তাঁর পরিবার এক চরম বিপদের হাত থেকে রক্ষা পান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই রেকর্ডিং বড় ভূমিকা পালন করে—২ জুন ১৯৭১ তারিখে লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট রেকর্ডিংটির প্রতিলিপি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানান, পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে রীতিমতো গণহত্যা চালাচ্ছে।মোজাম্মেল হোসেনের বাবা ও ভাই স্বাধীন দেশের পতাকা তুলছেন বাড়ির সামনে, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১
এপ্রিলের শেষের দিকে মূল অংশগুলো স্পুল টেপ থেকে একটি কম্প্যাক্ট ক্যাসেটে ট্রান্সফার করে একজন পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে তাঁরা সেটি ঢাকা টেলিভিশনের জামিল চৌধুরী এবং ন্যাপের রাজনীতিক মঈদুল হাসানের হাতে তুলে দেন। তাঁরা সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় অবশ্য তাঁদের পরিচয় তিনি জানতেন না। সেই ক্যাসেট হস্তান্তরের দিন পকেটে ক্যাসেট লুকিয়ে রিকশায় মৌচাক মার্কেটের দিকে যাওয়ার সময় রামপুরাগামী সেনাবাহিনীর একটা জিপ উল্টো দিক থেকে আসে। সেনারা তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলেও তারা তাঁকে না থামানোয় তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। মে মাসেই ‘আকাশবাণী সংবাদ পরিক্রমা’ এবং ‘সংবাদ বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে এটি সম্প্রচারিত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই রেকর্ডিং বড় ভূমিকা পালন করে—২ জুন ১৯৭১ তারিখে লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট রেকর্ডিংটির প্রতিলিপি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানান, পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে রীতিমতো গণহত্যা চালাচ্ছে।
ড. হোসেন ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের ওয়্যারলেস বার্তাও রেকর্ড করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় সেটি প্রকাশিত হয়। সেদিন বিকেলের দিকে তাঁরা ছাদ থেকে দেখেন যে ভারতীয় হেলিকপ্টার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। সন্ধ্যায় দীর্ঘ ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে তাঁরা বাড়ির বারান্দায় মোমবাতি জ্বালান। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বিশাল সমুদ্রে তাঁদের বাড়িটা যেন হয়ে উঠেছিল আলোর এক ছোট্ট দ্বীপ। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকালে তাঁর বাবা আর ভাই ফারুক বাড়ির সামনে সেই ২৫ মার্চের কালরাতে নামিয়ে সযত্নে লুকিয়ে রাখা জাতীয় পতাকাটি সগর্বে আবার উড়িয়ে দেন।
তিন
সামরিক কৌশল ও তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট মূলত একটি রাজনৈতিক সংকটকে নিছক সামরিক শক্তি দিয়ে চেপে ধরার এক চরম ব্যর্থ ও আত্মঘাতী দৃষ্টান্ত। সামরিক তাত্ত্বিক ক্লজউইটজের ভাষায় যুদ্ধ রাজনীতির ধারাবাহিকতা হলেও পাকিস্তানি জান্তা তাদের সামরিক লক্ষ্য, কৌশল ও উপকরণের মধ্যে যে সমন্বয় করেছিল, তার গোড়াতেই গলদ ছিল। তারা ভেবেছিল, আকস্মিক ও ভয়ংকর আক্রমণ চালিয়ে (শক অ্যান্ড অ) এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে (ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক) খুব সহজেই বিদ্রোহের আগুন নিভিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অন্ধত্ব ছিল যুদ্ধের মূল ভরকেন্দ্র বা ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ চিনতে না পারা। তারা ধরে নিয়েছিল, গুটিকয় রাজনৈতিক নেতা, বিদ্রোহী ছাত্রসমাজ ও বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিলেই পুরো প্রতিরোধব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। অথচ এই যুদ্ধের প্রকৃত ভরকেন্দ্রটি ছিল আপামর বাঙালির স্বাধীনতার অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা। অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় যেখানে জনগণের মন জয় করার কৌশল (কাউন্টার-ইনসারজেন্সি) সবচেয়ে কার্যকর, সেখানে তারা বেছে নিয়েছিল নির্বিচার নির্মূল বা ‘অ্যানাইহিলেশন’-এর পথ। এর পাশাপাশি, মাঝখানে ভারতের মতো একটি বৈরী রাষ্ট্র রেখে হাজার মাইল দূরের একটি জনপদে রসদ সরবরাহের বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ পুরো অপারেশনটিকে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
এই টেপের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো কোনো বাঙালির বয়ান থেকে নয়, কোনো ভারতীয় সূত্র থেকে নয়, কোনো পশ্চিমা সাংবাদিকের প্রতিবেদন থেকে নয়—পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিজ মুখে উচ্চারিত আলাপচারিতার মাধ্যমে এটি নিজেদের অপরাধ প্রামাণিকভাবে তুলে ধরে।মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন
ইতিহাসের দিকে তাকালে অপারেশন সার্চলাইটের এই কাঠামোগত ও কৌশলগত ভুলের সঙ্গে আলজেরিয়ায় ফরাসি বাহিনীর নির্মমতা, চেচনিয়ার গ্রোজনিতে রুশ আক্রমণ, পূর্ব তিমুরে ইন্দোনেশিয়ার ‘অপারেশন সেরোজা’ কিংবা ওয়ারশ অভ্যুত্থান দমনে নাৎসি বাহিনীর দমন–পীড়নের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মতোই, পাকিস্তানি বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সাঁজোয়া যানের জোরে সাময়িকভাবে ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তা সত্ত্বেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি তাদের জন্য একটি ‘কৌশলগত জয়, কিন্তু চূড়ান্ত পরাজয়’ (ট্যাকটিক্যাল সাকসেস, স্ট্র্যাটেজিক ফেইলিওর) হিসেবেই প্রমাণিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ, পিলখানাসহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর তাদের চালানো এই মাত্রাতিরিক্ত ও নির্বিচার বলপ্রয়োগ রাজনৈতিক সমাধানের সব দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয়। উল্টো এই নিষ্ঠুরতা পুরো বাঙালি জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র গেরিলা বা অসম যুদ্ধের (অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার) দিকে ঠেলে দেয়।
সামরিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে কেবল গায়ের জোরে কোনো ভূখণ্ডের সাময়িক দখল নেওয়া গেলেও একটি জাতির সম্মিলিত আত্মনিয়ন্ত্রণের স্পৃহাকে বুলেটে স্তব্ধ করা কঠিন।
চার
ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেনের রেকর্ড করা এই টেপটি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, ন্যায়বিচারের দাবিরও ভিত্তি। এই টেপে রেকর্ড করা কথোপকথন আংশিক হলেও এটি প্রমাণ করে যে ২৫ মার্চের অভিযান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সহিংসতা ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় আদেশে পরিচালিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ৩০০ ছাত্রকে হত্যা ‘চমৎকার কাজ’ বলে শাবাশি দেওয়া, ভোরের আলো ফোটার আগে লাশ গুম করার নির্দেশ, বাড়ির পর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ—এগুলো নির্মম অপরাধ প্রমাণের নানা শর্ত পূরণ করে।
এই টেপের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো কোনো বাঙালির বয়ান থেকে নয়, কোনো ভারতীয় সূত্র থেকে নয়, কোনো পশ্চিমা সাংবাদিকের প্রতিবেদন থেকে নয়—পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিজ মুখে উচ্চারিত আলাপচারিতার মাধ্যমে এটি নিজেদের অপরাধ প্রামাণিকভাবে তুলে ধরে। এই আত্মস্বীকারোক্তির মূল্য ইতিহাসের বিচারে অপরিমেয়।
ড. হোসেন ১৯৬২ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করার পর লাহোরের আণবিক শক্তিকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে তিনি বেলজিয়ামে যান। সেখানকার ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লুভেইনের নিউক্লিয়ার ফিজিকস সেন্টার থেকে ১৯৬৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচডি শেষে ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকার আণবিক শক্তিকেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। এমআইটির নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে এক বছরের জন্য ভিজিটিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি আবার ঢাকার আণবিক শক্তিকেন্দ্রে কাজ করেন। ১৯৮০ সালের পর থেকে তিনি প্রবাসজীবন যাপন শুরু করেন। তিনি ২০২০ সালে জাম্বিয়ার লুসাকায় অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অব জাম্বিয়া’ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বসবাস করছেন। তাঁর এই রেকর্ডিংয়ের কৃতিত্ব আর স্বীকৃতি নিয়ে কিছু দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা থাকলেও একাত্তর ঘিরে কলুষিত দলীয় রাজনীতি তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
বেতার কথোপকথন থেকে • ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কন্ট্রোল : আপনার কী মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক সংখ্যা কত হবে? আমাকে শুধু আনুমানিক একটি সংখ্যা দিন। আপনার মতে কতজন নিহত বা আহত বা বন্দী হবে। আমাকে শুধু একটি মোটামুটি হিসাব দিন। ওভার।
৮৮ : ৮৮, অপেক্ষা করুন। আনুমানিক ৩০০। ওভার।
কন্ট্রোল : চমৎকার। ৩০০ জন নিহত? নাকি কেউ আহত, বন্দী হয়েছে? ওভার।
৮৮ : ৮৮, আমি শুধু একটি জিনিসেই বিশ্বাস করি। তা হলো ৩০০ জন নিহত। ওভার।
কন্ট্রোল : ৮৮, হ্যাঁ। আমি আপনার সঙ্গে একমত। এটি অনেক সহজ, আপনি জানেন। কোনো প্রশ্ন নেই, কিছুই করা হয়নি, আপনাকে কিছুর ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আবারও, চমৎকার কাজ।
২. পতাকা ওড়ানোর শাস্তির হুমকি
‘যে বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা থাকবে, তার পরিণতির জন্য মালিক দায়ী থাকবে। শহরে কোনো কালো পতাকা থাকবে না এবং কোথাও বাংলাদেশের কোনো পতাকা দৃশ্যমান হবে না। আর যদি সেগুলো নামানো না হয়, তবে এর পরিণতি সত্যি সত্যিই ভয়াবহ হবে।’
৩. দেখামাত্র গুলি এবং বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ
‘যে কাউকে রাস্তার অবরোধ তৈরি করতে দেখলে তাকে ঘটনাস্থলেই গুলি করা হবে, এক নম্বর। দুই নম্বর, কোনো এলাকায় রাস্তার অবরোধ তৈরি করা হলে সেই এলাকার লোকদের বিচার করা হবে এবং দায়ী করা হবে, আর সেই অবরোধের বাঁ আর ডান দিকের বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’
৪. ভারী অস্ত্র ব্যবহার ও হত্যার স্বীকারোক্তি
‘একবার আমরা রোমিও রোমিও (ট্যাংক-বিধ্বংসী অস্ত্র) দিয়ে গুলি চালানোর পর আর কোনো গুলির শব্দ শুনিনি। তবে আমরা কয়েকজনকে শেষ করে দিয়েছি।’
৫. সংবাদপত্র অফিস ধ্বংস করা
‘৯৯ : পিপলস ডেইলির কী অবস্থা? ওভার।
২৬ : ‘উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি আবার বলছি, উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
৬. পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ
‘৯৯ : আপনারা কি পুলিশ লাইন্সও শেষ করে দিয়েছেন? ওভার।
২৬ : ৯৯-এর জন্য ২৬। হ্যাঁ, আমি বলছি, টু থাউজেন্ড, পুলিশ লাইন্সে আগুন জ্বলছে।’
৭. মৃতদেহ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ
‘ইমাম বলেছেন, প্রথম আলো ফোটার আগেই এই সমস্ত মৃতদেহ সরিয়ে ফেলতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দিন।’
৮. প্রমাণ লোপাট বা লাশ গুমের কৌশল
‘হ্যাঁ, তাদের সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন। আপনি স্থানীয় শ্রমিক ব্যবহার করতে পারেন এবং তাদের জনসাধারণের স্থান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে পারেন।’
৯. লাশ গুম করার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি
‘লাশগুলো সংগ্রহ করে সেগুলো গুম করতে আমার আনুমানিক এক ঘণ্টা সময় লাগবে।’
১০. মৃত্যুদণ্ড এবং বাড়িঘর ধ্বংসের নিষ্ঠুর নির্দেশ
‘আমি অবশ্যই চাই যে আপনি নিশ্চিত করুন যাতে কেউ কোনো রাস্তার অবরোধ তৈরি না করে। আর যদি কেউ তা করে, তবে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো, একই এলাকার লোকদের ধরুন। অবরোধের উভয় পাশের বাড়িঘর ধ্বংস করে দিন। আর সম্ভব হলে আপনি তাদের পুরস্কৃত করতে পারেন, এমন একটি পুরস্কার যা হলো শাস্তি—তাদের কয়েকজনের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের ছেড়ে দিন।’