‘শুধু সপ্তাহ নয়, বছরের পর বছর থাকুক শান্তি’

· Prothom Alo

মাঠে ক্রিকেট খেলছে শিশুরা। সড়কের পাশের দোকানগুলোয় লোকজন কেনাকাটায় ব্যস্ত। নানা প্রয়োজনে স্থানীয় বাসিন্দারা ছাড়াও বাইরের লোকজন অবাধে এলাকায় আসা-যাওয়া করছেন। পুলিশের টহল দল ছাড়াও রয়েছে দুটি তল্লাশিচৌকি। যৌথ বাহিনীর অভিযানের এক সপ্তাহ পর গতকাল সোমবার দুপুরে এই চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

জঙ্গল সলিমপুরের ১ নম্বর সমাজের আবু বক্কর (রা.) মসজিদের পাশ দিয়ে পাহাড় বেয়ে কিছুদূর যেতেই সাক্ষাৎ হয় মো. রাশেদ (৫০) নামের এক বাসিন্দার সঙ্গে। যৌথ বাহিনীর অভিযান–পরবর্তী সময় নিয়ে জানতে চাইলে হাসিমুখে তিনি বলতে থাকেন, ‘আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। আমরা চাই শান্তি। শুধু সপ্তাহ নয়, বছরের পর বছর শান্তি থাকুক।’

মো. রাশেদ, স্থানীয় বাসিন্দা।আগে সন্ত্রাসীদের মধ্যে দখল-বেদখল নিয়ে মারামারি হতো। আমরা সাধারণ বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকতাম। এখন অভিযানের পর পুলিশ পাহারা রয়েছে। সন্ত্রাসীরাও এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

পেশায় অটোরিকশাচালক রাশেদ ২০০৯ সালে জঙ্গল সলিমপুর আসেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে। রাশেদ বলেন, ‘আগে সন্ত্রাসীদের মধ্যে দখল-বেদখল নিয়ে মারামারি হতো। আমরা সাধারণ বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকতাম। এখন অভিযানের পর পুলিশ পাহারা রয়েছে। সন্ত্রাসীরাও এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।’

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক ঢুকে গেছে পাহাড়ের ভেতরে। সে পথেই শুরু সলিমপুর। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—মূলত এ দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

এলাকায় র‍্যাব–পুলিশের টহল বাড়ায় খুশি ছিন্নমুলের বাসিন্দা মো. রাশেদ। গত রোববার বেলা ১টায় চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে

প্রথমবারের মতো ৯ মার্চ এলাকাটিতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। উল্টো অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এবার অভিযানের পর সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দিয়েছে। এ অবস্থায় জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে পৃথক দুটি চৌকি বসানো হয়েছে।

প্রথমবারের মতো ৯ মার্চ এলাকাটিতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। উল্টো অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে গতকাল জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লোকজন নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছেন। সড়কের পাশের দোকানগুলোতেও লোকজনের ভিড়। র‍্যাব-পুলিশ সদস্যদের টহলও অব্যাহত রয়েছে।

৯ মার্চের যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন; মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ এখনো পলাতক। এলাকাবাসী জানান, অভিযানের আগে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকনের দখলে আর আলীনগর এলাকা ইয়াসিনের দখলে ছিল।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ, প্রশাসনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই সেখানে আর সন্ত্রাসীরা ঢুকতে পারবে না। তাদের সেই সাহস এখন আর নেই। তার আগেই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা যে দলের হোক না কেন, কোনো ছাড় নেই। যেকোনো মূল্যে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্রও ছাড় নেই।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের একজন মো. আবু সাঈদ। প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবারসহ এই এলাকায় বসবাস করে আসছেন তিনি। গত রোববার দুপুরে তোলা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাঁরা চান জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসমুক্ত থাকুক। সন্ত্রাসীরা যাতে আর এলাকায় আসতে না পারে। এলাকায় নির্বিচার পাহাড় কেটে যাতে আর বসতি না হয়, সেটিও তাঁরা চান।

জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়–সংলগ্ন ছিন্নমূল এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ। পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর টিনের ঘর। ২০০৬ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে এসেছেন তিনি। জানতে চাইলে আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা কোনো অবস্থাতেই যাতে এলাকায় ফিরতে না পারে। এই এক সপ্তাহ ধরে শান্তিতেই আছি। আমাদের দাবি থাকবে, সরকার আমাদের তুলে দিলেও যাতে উপযুক্ত জায়গায় পুনর্বাসন করে।’

পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। জানতে চাইলে র‍্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের পরিচয় তারা সন্ত্রাসী। তাদের ধরতে র‌্যাব কাজ করছে। যেভাবেই হোক জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হবে। তারা আর ফিরতে পারবে না।’

Read full story at source