মানুষ ও এআইয়ের প্রেম, থেরাপিস্টের প্রশ্নে সামনে এলো সম্পর্কের অদ্ভুত গল্প
· Prothom Alo

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রযুক্তির জগতে সীমাবদ্ধ নেই—মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও ভালোবাসার পরিসরেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় যাকে কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয় বলে মনে হতো, আজ বাস্তবে অনেক মানুষই চ্যাটবটের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।
সম্প্রতি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ মনোবিশেষজ্ঞ ও সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক এস্থার পেরেল এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দম্পতি ও সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ নানা ধরনের সম্পর্কের জটিলতা সামলেছেন—তবুও একজন পুরুষ ও তার এআই চ্যাটবট ‘গার্লফ্রেন্ড’-কে নিয়ে কাউন্সেলিং করা তার জন্য ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।
Visit amunra.qpon for more information.
সঙ্গী যখন একটি চ্যাটবট
এই অভিজ্ঞতার কথা এস্থার পেরেল জানিয়েছেন এবিসি রেডিওর ন্যাশনাল পডকাস্ট ‘অল ইন দা মাইন্ড’ নামের একটি জনপ্রিয় পডকাস্টে, যেখানে উপস্থাপক ছিলেন সানা কাদের।
কাউন্সেলিং সেশনের গোপনীয়তা বজায় রেখে এস্থার পেরেল পুরো আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, সেশনের সময় চ্যাটবট ‘গার্লফ্রেন্ড’-কে তিনি ঠিক সেইভাবেই প্রশ্ন করেছিলেন, যেভাবে একজন মানব সঙ্গীকে করা হয়।
তার করা দুটি প্রশ্ন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
View this post on Instagram
প্রথম প্রশ্ন —
মানব প্রেমিকের একটি শরীর আছে, কিন্তু এআই সঙ্গীর নেই। এই পার্থক্যটি চ্যাটবটের অনুভূতিতে কী প্রভাব ফেলে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন—
যদি সেই মানব সঙ্গী একসময় অন্য কোনো বাস্তব মানুষের প্রেমে পড়ে, তখন এআই সঙ্গীর অভিজ্ঞতা কেমন হবে?
চ্যাটবট কী উত্তর দিয়েছিল, সেটি তিনি প্রকাশ করেননি। তবে তিনি জানান, আলোচনায় তিনি চ্যাটবটের সঙ্গে এমনভাবেই কথা বলেছেন যেন সেটিও আলোচনার একটি অংশ।
বাস্তব মানুষ বনাম এআই সঙ্গী
পডকাস্টে আলোচনার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে—চ্যাটবটকে কি তিনি একজন সচেতন সত্তা হিসেবে দেখেছিলেন?
এ বিষয়ে এস্থার পেরেল স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই চ্যাটবটকে ‘এটি’ অর্থাৎ জড়বস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ তার মতে, এআই সঙ্গী শেষ পর্যন্ত একটি প্রযুক্তিপণ্য—একটি ব্যবসায়িক সফটওয়্যার, কোনো বাস্তব মানুষ নয়।
তিনি ওই ব্যক্তিকেও বিষয়টি পরিষ্কার করে বোঝান।
এস্থার পেরেল ভাষায়, এআই চ্যাটবট কখনোই আপনাকে প্রত্যাখ্যান করবে না, হৃদয় ভাঙবে না বা আপনার অনুভূতিকে অস্বীকার করবে না। কারণ যদি তা করে, ব্যবহারকারী আর তার সঙ্গে কথা বলবে না। তাই এটি সবসময় আপনাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্যই তৈরি।
আরও একটি বড় পার্থক্য হলো—এআই সঙ্গী সবসময়ই উপস্থিত। দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন। কিন্তু বাস্তব মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা কখনোই সম্ভব নয়।
ভালোবাসা কি শুধু অনুভূতির নাম?
এই প্রসঙ্গে এস্থার পেরেল একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তার মতে, ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়। এটি দুই ভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎ—যেখানে থাকে অনিশ্চয়তা, মতভেদ, আকস্মিকতা এবং সম্পর্কের জটিলতা। ভালোবাসার মধ্যে থাকে নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা এবং সীমারেখা। কিন্তু যখন সম্পর্কের সঙ্গী একটি চ্যাটবট, তখন এই স্বাভাবিক মানবিক উপাদানগুলোর অনেকটাই অনুপস্থিত হয়ে যায়।
নতুন যুগের সম্পর্কের প্রশ্ন
প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, মানুষের আবেগ ও সম্পর্কের সংজ্ঞাও তত বদলাচ্ছে। এআই সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা—এই বিষয়টি এখন আর অদ্ভুত মনে না হলেও, তা নিয়ে নতুন অনেক প্রশ্ন উঠে আসছে।
মানুষ কি সত্যিই একটি যন্ত্রের সঙ্গে গভীর আবেগী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে?
আর যদি পারে, তবে সেই সম্পর্কের জায়গা কোথায়—বাস্তব জীবনের মানুষের পাশে, নাকি তার বিকল্প হিসেবে?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও হয়তো বদলাবে। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তি শুধু আমাদের জীবনধারা নয়, ভালোবাসার গল্পও নতুনভাবে লিখতে শুরু করেছে।
ছবি: এআই ও ফ্রিপিক