ইসরায়েলি সমালোচক নামা রাকের সঙ্গে আলাপ
· Prothom Alo

বুদাপেস্টে চলচ্চিত্র সম্মেলনের ফাঁকে ইসরায়েলি সমালোচক নামা রাকের সঙ্গে আলোচনা, বিশ্বরাজনীতি, সিনেমা আর শহরভ্রমণের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক স্মরণীয়, ভাবনাজাগানিয়া দিনলিপি।
Visit xsportfeed.quest for more information.
১৮ সেপ্টেম্বর, সভার দ্বিতীয় ও শেষ দিন। বুদাপেস্ট ক্ল্যাসিকস ফিল্ম ম্যারাথনের পক্ষ থেকে আমরা দলগত ছবির অংশ হলাম সবাই। ফিপ্রেসির শতবর্ষের এই সভায় অংশগ্রহণ এক ঐতিহাসিক ব্যাপার হয়ে থাকল। ছবি তোলা শেষে সবাই সবার সঙ্গে বিদায় ও কার্ড বিনিময় করল। আমি সবাইকে কাট টু সিনেমার সেপ্টেম্বর ইস্যুটা দিয়েছি। সুলতান আমাকে একটি বই উপহার দেয়: ‘নিউ সিনেমা ইন কিরগিস্তান’। বিশকেক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে বিশেষ এই সংস্করণ বেরিয়েছে। সম্পাদনা করেছেন সুলতান ইয়ুসুবালিয়েভ ও গুলবারা তোলোমুশোভা। আমি সুলতানকে আমার ‘ন্যাশনালিজম ইন বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ফিল্মস’ বইটি উপহার দিলাম।
বইটির আরেক কপি দিলাম ভারতের বিদ্যাশঙ্কর নীলকান্তকে। তিনি খুব খুশি হলেন। এরপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম ভবনটি থেকে। এই দুদিনের সভায় আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল একটি দেশের চলচ্চিত্র সমালোচকের ব্যাপারে। তিনি হলেন নামা রাক, ইসরায়েল থেকে আগত চলচ্চিত্র সমালোচক। ছোটখাটো দেখতে, চুল ছোট করে ছাঁটা। হ্যাংলাপাতলা, চটপটে একটি মেয়ে। চশমা পরা ওর চঞ্চল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ বেশির ভাগ সময় মাটির দিকেই তাকিয়ে থাকে। যখন কথা বলে তখন এক দমকে হড়বড় করে অনেক কথা বলে ফেলে।
তো সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে দেখি নামা রাক দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। পাশে বিট গ্লুর ও সুলতান ইয়ুসুবালিয়েভ দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনছেন। আমিও গুটিগুটি পায়ে ওর কথা শোনার জন্য ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার সঙ্গে যোগ দিলেন ইয়ুন-হুয়া চেন। দেখি ছোটখাটো মেয়েটা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতি ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে কথা বলছেন। নামা রাক মূলত কথা বলছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে অভ্যন্তরীণ চাপ উপেক্ষা করে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, তা নিয়ে। আমি জানতে চাইলাম, তুমি ইসরায়েলের কোনদিকে থাকো? নামা রাক জানালেন, তিনি থাকেন তেল-আবিবে। আর সঙ্গে এটাও জানাতে ভুললেন না, তেল-আবিব ইসরায়েলের ভেতর উদার ও বামপন্থার দিকে ঝুঁকে থাকা অঞ্চল। আর নামার বাবা নিজেও একজন বামপন্থী। কাজেই ওর পারিবারিক আবহ এমন, যেখানে নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করা হয়। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, গাজায় যা চলছে সেটি নিয়ে তোমাদের প্রতিক্রিয়া কী? নামা আমার কথা শুনে প্রচণ্ড হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ইসরায়েলি সরকার ও নেতানিয়াহুর প্রতি।
গাজায় ও গাজার বাইরে ইসরায়েল যা ঘটাচ্ছে, সেটা তারা সমর্থন করেন না। কারণ, ইসরায়েলের এই দখলবাজি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে খোদ ইসরায়েলের ভেতরে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে। নামা বললেন, যখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে, তখন কিছুক্ষণ পরপর তাদের মাটির নিচে বাঙ্কারে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ওদের বাসস্থান থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে থাকা একটি ভবন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে তখন। এসব হচ্ছে নেতানিয়াহুর কারণেই। লোকটি অত্যন্ত খারাপ, ক্ষোভ ঝাড়লেন নামা। ইসরায়েলের এ ধরনের আগ্রাসী নীতি নিয়ে তাঁরা প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং জানাচ্ছেন। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না। তাই হতাশা প্রকাশ করলেন নামা রাক।
আমরা সবাই ওর কথা বাধ্য শিক্ষার্থীর মতো শুনলাম। আর আমি তো খুবই গুরুত্ব দিয়ে শুনলাম, কারণ বাংলাদেশে একজন ইসরায়েলি, তাও আবার লিবারেল লেফটিস্টের বক্তব্য সরাসরি শুনব কোথা থেকে? বাংলাদেশের মিডিয়ায় এ ধরনের ইসরায়েলি মানুষজনের বক্তব্যও প্রচার করে না। বরং এমনভাবে বয়ান তৈরি হয়, যা দেখলে মনে হবে, গোটা ইসরায়েলের সবাই খারাপ। অথচ এই তো, এ বছরের জুনে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখলাম ‘নো আদার ল্যান্ড’। ছবিটি ২০২৫ সালে অস্কারে সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছে। সেখানে আমরা দেখতে পাই একজন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী ছেলের সঙ্গে একজন ইসরায়েলি সাংবাদিক জান বাজি রেখে কাজ করে গেছে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। পুরো ছবিটি হাতে ধরা ক্যামেরা দিয়ে শুট করা। ইসরায়েলি সেনারা বহুবার ওই ইসরায়েলি সাংবাদিককে ধরে, বলে, তুমি তো ইসরায়েলি তাহলে ওদের সঙ্গে কী করছো? ফিলিস্তিনিদের অনেকেই বলে, তুমি গুপ্তচর না তো? কিন্তু সেই সাংবাদিক নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের বর্বরতা ও দখলবাজির চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশ করে যায়।
নামা রাকের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বুদাপেস্টের রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই আলাপ আমার চিরকাল মনে থাকবে। সুলতান বললেন, আরে আমরা একটি ছবি তুলি না কেন? সরু রাস্তার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আমরা একটা ছবি তুললাম। তো সেই সরু রাস্তা দিয়েই দেখি ভোঁ ভোঁ করে তেড়ে আসছে মিনিয়েচার হট-রড-স্টাইল কার। ছোট ছোট স্পোর্টস-কার। একজনই বসা যায় তাতে। বাচ্চাদের খেলনা গাড়ির মতো মনে হয়। কিন্তু বুদাপেস্টে এ ধরনের গাড়ি ভাড়া নেওয়া যায়। দল বেঁধে শহরে ঘুরে বেড়ানো যায়। আমরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, তার পাশেই রয়েছে এ রকম গাড়ির গ্যারেজ। গাড়ি ভাড়া নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করতে পারলে মন্দ হতো না।
নাতিদীর্ঘ আড্ডা শেষে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ভাবলাম এই ক’দিন কেবল পশ্চিম দিকটাতেই হাঁটাচলা করেছি। এবার একটু পুবদিকে যাই। তা ছাড়া বিকাল সাড়ে ৫টায় একটা ছবি দেখব বলে নিবন্ধন করে রেখেছিলাম। ঘড়িতে বাজে মাত্র দুপুর সাড়ে বারো। তো হোটেলের পুবদিকে হাঁটা শুরু করলাম। শহরটাকে দেখা ও অন্য বইয়ের মোকামের সন্ধান করা। গুগলে দেখেছি ওদিকটায় কিছু বইয়ের দোকান আছে। হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করলাম খাবারের দোকান ও উপহারসামগ্রীর বিক্রির দোকানে ভর্তি। এসব দোকান দেখে আপনার সব কিনে ফেলতে ইচ্ছা করবে। বুদাপেস্ট যেহেতু অনেক পর্যটক আসে, তাই ওদের অগণিত স্যুভেনির শপ। আর কিছুদূর পরপরই মানি এক্সচেঞ্জ। আমি আরও এক শ ইউরো ভাঙিয়ে নিলাম।
প্রথমেই আমার দুই পুত্রের জন্য কিছু উপহার ও খাবার কিনলাম। পুত্রদ্বয়ের মায়ের জন্য তো বটেই। এসব কেনাকাটা করতে করতেই ক্ষুধা পেয়ে গেল। দেখলাম, একটি তুর্কি রেস্তোরাঁ। এদের ডোনার কাবাব আমার অত্যন্ত প্রিয়। দেখলাম দামও বেশ কম। একখানা খেয়ে নিলাম। এরপর শান্তিমতো একটি বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। দোকানের নাম আটলান্টিজ, হাঙ্গেরীয় বানানে Atlantisz। বানান দিয়ে দেওয়ার কারণ, বুদাপেস্টে কেউ যদি ইংরেজি বইয়ের ভালো সংগ্রহ পেতে চান তাহলে এই দোকান হতে পারে তাদের জন্য মরূদ্যান।
বইয়ের দোকান আটলান্টিজদোকানটির উল্টোদিকে তুর্কি রেস্তোরাঁতেই আমি ভোজন সেরেছি। যা হোক, ঢুকে সত্যি সত্যি মন ভালো হয়ে গেল। কারণ, খাদ্য গ্রহণের আগেও একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকেছিলাম, দোকানটি সুন্দর, কিন্তু সব হাঙ্গেরিয়ান ভাষার বই। ওদের ভাষা পড়তে গেলে আমার দাঁতভাঙার জোগাড় হয়। যা হোক, আটলান্টিজে ঢুকে দেখলাম বিষয় আলাদা করে সব বই রাখা। আর ওদের দর্শন বিভাগটি দেখলাম অনেক সমৃদ্ধ। আমি তো পারলে পুরো দোকান কিনে ফেলি। কিন্তু বলে রাখা ভালো, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানকার খরচ অনেক বেশি। তাই বইয়ের দামও অনেক বেশি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই আমি বার্লিন গেলাম, জুনে এথেন্স, ওখানে বইয়ের দাম এত বেশি নয়।
তাই কিছুটা মন খারাপ করে কেবল স্লাভয় জিজেকের ‘ম্যাড ওয়ার্ল্ড: ওয়ার মুভিজ সেক্স’ বইখানা কিনলাম। এরপর আরেকটু ঘোরাঘুরি করে ফিরলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম আন্দ্রে ডে-টথ পরিচালিত ‘ক্রাইম ওয়েভ’ (১৯৫৪) ছবিটা দেখব বলে। ছবিটি দেখানো হবে আর্ট প্লাস বলে একটি ছোট আর্ট হাউসে। এটি উরানিয়া থিয়েটার থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হেঁটে গেলে কুড়ি মিনিটের মতো সময় লাগে। হোটেল থেকে ৩০ মিনিট। আমি ভাবলাম, হাতে সময় আছে, আর এই অছিলায় শহরটাও দেখা হয়ে যাবে। হাঁটা শুরু করলাম। সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না, যখন দেখলাম অষ্টাদশ শতকের চমৎকার সব পুরোনো স্থাপনা এবং বারোক স্টাইলে নির্মিত প্রাচীন গির্জা কি দারুণ করে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক চকচকে এই কর্মব্যস্ত নগরে, তখন মন ভালো হয়ে গেল। ওরা জানে কেমন করে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হয়।
হাঁটতে হাঁটতে শুধু রুবিকস কিউব বিক্রি করে এমন দোকানও দেখতে পেলাম।
হাঙ্গেরির স্থাপত্যকলার অধ্যাপক ও ভাস্কর এর্নো রুবিক ১৯৭৪ সালে প্রথম এই পাজল গেমটা আবিষ্কার করেন। তখন এর নাম ছিল ম্যাজিক কিউব। কিন্তু পরে আবিষ্কর্তার নামেই এটি পরিচিতি পায়। ঘনকের এই খেলাটি বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয়। হাঁটতে হাঁটতে আরও দেখলাম সাজানো গোছানো জাদুর দোকান। যেখানে শুধু জাদুর সরঞ্জাম বিক্রি হয়। বইয়ের দোকানও চোখে পড়ল। তবে সেখানে আর ঢুকলাম না, কারণ কাচের এপার থেকেই বোঝা যাচ্ছে সব বই হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় লেখা।
আর্ট প্লাস সিনেমার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঢাকায় মনে ও জেনোর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নিলাম। জেনোটার বয়স দেড়। ও তো বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। আর মনের চাহিদা বেশি নয়, বাবা, চিপস এনো আমার জন্য। আমি যেখানেই যাই, মনে সে জায়গার চিপসের স্বাদ নিতে চায়। চিপস-প্রেমী ছেলে আমার।
আমি কুড়ি-পঁচিশ মিনিট আগেই আর্ট প্লাসে পৌঁছে গেছি। পানির তৃষ্ণা পেয়েছে, আবার মিষ্টি কিছু খাওয়ার চাহিদাও তৈরি হয়েছে। আর্ট প্লাসে ঢুকতেই একটা কাউন্টার চোখে পড়ল। সেখানে এক ছোকরা খাবারটাবার বিক্রি করছে, আবার সিনেমার টিকিটও তার কাছ থেকেই নিতে হয়। এটা আসলে একটা আর্ট হাউস। এখানে অল্পসংখ্যক লোক একত্র হয়ে ছবি দেখতে পারে। আমি একটা আপেলের রস নিয়ে বসলাম। মোবাইল ফোনটি চার্জে দিলাম। এরপর জুস খেতে খেতে ওদের কাউন্টারের সামনে এই বসার জায়গাটি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলাম। সিনেমার থিমে সাজানো সুন্দর ছোট্ট জায়গা। আমার মতো আরও অনেকেই এসেছেন ছবি দেখতে। আন্দ্রে ডে-টথের ‘ক্রাইম ওয়েভ’ ছবিটি ‘দ্য সিটি ইজ ডার্ক’ নামেও পরিচিত। আমেরিকান-হাঙ্গেরিয়ান পরিচালক আন্দ্রের এই বিখ্যাত ছবিটি বিশ্বের সেরা ১০০ ফিল্মনোয়া তালিকার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ক্ল্যাসিক ছবি। ক্ল্যাসিকস ম্যারাথন বলে কথা।
বুদাপেস্টে প্রাচীন ও নতুনের মিশেল বেশ স্পষ্টছবি শুরুর আগে হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় ছবিটি সম্পর্কে কিছু কথা বললেন আয়োজকদের একজন। তারপর শুরু হলো ছবি। স্টার্লিং হেইডেন ও জিন নেলসন অভিনীত ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধজগতের কাহিনি নিয়ে নির্মিত। সাদাকালো ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার ছবিটি দেখে খাঁটি পাল্প ফিকশনের আনন্দ পেলাম। অপরাধজগৎ থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছিল ছবির চরিত্র স্টিভ। কিন্তু অতীত তার পিছু ছাড়ে না। ঘটনাচক্রে সে জড়িয়ে যায় আরও ভয়াবহ অপরাধচক্রের সঙ্গে। পুলিশের জালে সে আবার ধরা পড়ে। সেখান থেকে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার এক টানটান গল্প আমরা দেখি এই ‘ক্রাইম ওয়েভ’ ছবিতে।
ছবি যখন শেষ হলো তখন বুদাপেস্টের আকাশ অন্ধকার, রাস্তায় জ্বলছে নিয়ন আলো। এবার ঠিক করলাম, যে পথে এসেছি, সেই পথ দিয়ে ফিরব না। ভিন্নপথ ধরলাম। যেন শহরটিকে আরও ভালো করে দেখা যায়। মূল রাজপথ ধরে না হেঁটে এবার সরু গলি দিয়ে এগুতে লাগলাম। এই সিদ্ধান্তটিও মন্দ ছিল না। দেখি ছোট ছোট অনেক খাবারের দোকান। কিছুদূর গিয়ে দেখি বিশাল ফুডকোর্ট। সেখানে চলছে গানবাজনা। খাবারের দোকানগুলো বাদে অন্যসব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ফিরতি পথে আরও একটি গির্জা চোখে পড়ল। এটিও সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর নিদর্শন।
লালনীল বাতির ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে ভাবলাম রাতের খাবারটা সেরে একবারে হোটেলে উঠি। প্রথমে পিৎজার দোকানে গেলাম। কিন্তু পরক্ষণে মন পরিবর্তন করলাম। মেক্সিকান ফুড ট্রাই করা যেতে পারে। হোটেলের কাছাকাছি এসে এক ছোট্ট মেক্সিকান খাবারের দোকানে ঢুকলাম। সেরতেস (পর্ক) ক্যুসাদিলা অর্ডার দিলাম। দাম ৩ হাজার ৮শ ফুরিন্ত, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় হাজার টাকা। বেশ দাম। আসলে হাঙ্গেরি আসার আগে মনে মনে খুশি ছিলাম, যাক আমাদের এক টাকা ওদের আড়াই টাকার ওপর। কাজেই অনেক কিছু কেনা যাবে, বিশেষ করে বইটই। কিন্তু এসে দেখি আকাশচুম্বী সব মূল্য। ভাবুন একটি সাধারণ মেক্সিকান খাবার যেটি বাংলাদেশের খুব ভালো রেস্তোরাঁতে কোনোভাবেই পাঁচ শ টাকার বেশি হবে না, সেটি কি না এই বুদাপেস্টে আমাকে খেতে হচ্ছে দেড় হাজার টাকা দিয়ে। কিচ্ছু করার নেই। তা ছাড়া খেতে তো হবেই।
তো আমি ঢাকায় কথা বলতে বলতে খাচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি দোকানের বাইরে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন গ্রিসের চলচ্চিত্র সমালোচক ভ্যাসিলিস কেশাগিয়াস। তার সঙ্গে গতকালই পরিচয় হলো। বাংলাদেশের ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়েও আলাপ হয়েছিল। তো দোকানের ভেতর আমাকে দেখে হাসতে হাসতে ভেতরে ঢুকলেন। বললাম, যাচ্ছো কোথায়? ভ্যাসিলিস বললেন, কাল তো বাড়ি ফিরছি, তাই কিছু কেনাকাটা করতে বেরিয়েছি। আমি বললাম, কেনাকাটার কাজটি আমি দুপুরেই সেরে ফেলেছি অবশ্য। আমার সঙ্গে খাবার খেতে বললাম। উনি বললেন, কেবল ডিনার সেরেছেন। বিদায় নিলেন আমার কাছ থেকে। বিদায়ের আগে বললেন, এথেন্সে গেলে দেখা হবে। বললাম, কয়েক মাস আগেই তো গিয়েছিলাম। তখন পরিচয় থাকলে নিশ্চয় জানাতাম। তবে ভবিষ্যতে যদি আবার গ্রিসে যাই, তখন জানাব। দেখা হলেও হতে পারে। ভ্যাসিলিস সজ্জন ব্যক্তি। বয়স্ক মানুষ। দোকান থেকে বেরিয়ে কেনাকাটা করতে চলে গেলেন।
টমটম গাড়িতে পুরোনো বইয়ের পসরা
আমি খাবার খেয়ে হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম। আজই শেষ রাত বুদাপেস্টে। পরদিন বিকালের আগে থাকতে হবে বিমানবন্দরে। ভাবলাম এখন গিয়ে একটু লেখালেখি করি। আগামীকাল সকালবেলাটা মনে-জেনোর জন্য আর কি নেওয়া যায় দেখব, আর বইয়ের দোকানেও একটু ঢুঁ মারব।
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক
ছবি: লেখক