পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ৮ মাসে ৯০০ জনকে হত্যা করেছে পুলিশ: আসলে কী ঘটছে

· Prothom Alo

গত বছরের নভেম্বর। পাকিস্তানের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিসিডি) সশস্ত্র কর্মকর্তারা জুবাইদা বিবির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মুঠোফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, এমনকি তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা অর্থকড়ি—সবকিছু নিয়ে যান। তাঁর ছেলেদেরও ধরে নিয়ে যান তাঁরা। ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর শহরে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে জুবাইদার পরিবারের পাঁচ সদস্যই মারা যান। পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক অভিযানে পুলিশের হাতে তাঁরা নিহত হন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন জুবাইদার ছেলে ইমরান (২৫), ইরফান (২৩), আদনান (১৮) ও তাঁর দুই জামাতা।

Visit catcross.biz for more information.

পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) একটি অনুসন্ধানী দলকে জুবাইদা বলেন, ‘তারা (পুলিশ) বাহাওয়ালপুরে আমাদের বাড়িতে ঢুকে যা কিছু ছিল, সব নিয়ে গেছে।’

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আট মাসে পুুলিশের ৬৭০টি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরসিপি। এতে ৯২৪ জন সন্দেহভাজন অপরাধী নিহত হয়েছেন।

জুবাইদা আরও বলেন, ‘আমরা তাদের (পুলিশ) পিছু পিছু লাহোর পর্যন্ত গেছি। আমার ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছি। কিন্তু পরদিন সকালের মধ্যে পাঁচজনই মারা যায়।’

জুবাইদা বলেন, এ ঘটনার পর তিনি একটি পিটিশন দাখিল করলে পুলিশ তাঁকে হুমকি দেয়, সেটি প্রত্যাহার না করলে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও মেরে ফেলা হবে।

জুবাইদার স্বামী আবদুল জব্বার জোর দিয়ে বলেন, তাঁর ছেলেদের কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। তাঁরা কর্মজীবী ও বিবাহিত ছিল। তাঁদের সন্তানসন্ততিও ছিল।

জুবাইদার পরিবারের এ চাঞ্চল্যকর তথ্য এইচআরসিপির ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কৌশলগত নীতি অনুসরণ করছে পাঞ্জাবের সিসিডি।

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৮ মাসে পুলিশের ৬৭০টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরসিপি। এতে ৯২৪ জন সন্দেহভাজন অপরাধী নিহত হয়েছেন।

ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থা এবং দ্রুত ‘অপরাধ দমনের সাফল্য’ দেখানোর রাজনৈতিক চাপই পুলিশকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করছে।

গত বছরের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল সিসিডি। লক্ষ্য ছিল, গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধ দমন করা।

তবে এইচআরসিপি বলছে, এ বাহিনী সাধারণ পুলিশের নিয়মের বাইরে গিয়ে একটি ‘আলাদা ক্ষমতার উৎস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এমনভাবে কাজ করছে যেন তাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।

সংস্থাটি বলছে, এ বাহিনী আসার পর হুট করে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। তারা সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার বা আদালতে নেওয়ার বদলে সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলছে।

ঘটনাগুলো পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থাকে হুমকিতে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যদি রাষ্ট্রই আইন ভেঙে মানুষ হত্যা করে, তবে নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা আর থাকল কোথায়?

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের ‘নিরাপদ পাঞ্জাব’ রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সিসিডি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্ধর্ষ অপরাধী ও আন্তজেলা গ্যাং দমনের লক্ষ্য নিয়ে এ বিশেষায়িত বাহিনী যাত্রা শুরু করে।

এইচআরসিপির পরিচালক ফারাহ জিয়া বলেন, পাঞ্জাবে বন্দুকযুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস অনেক পুরোনো। এটি ১৯৬০-এর দশকেই শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ হলো, সেখানকার পুলিশের দীর্ঘদিনের একটি সংস্কৃতি; যেখানে তারা কাউকে নির্যাতন করলেও কোনো বিচার বা শাস্তি হয় না।

ফারাহ জিয়া বলেন, পরে এ সংস্কৃতি অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। এইচআরসিপি প্রতিবছর সিন্ধুসহ অন্যান্য প্রদেশেও শত শত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা নথিবদ্ধ করে।

ফারাহ জিয়া আল–জাজিরাকে বলেন, সরকার অপরাধ কমানোর জন্য সঠিক পথে না হেঁটে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সরাসরি হত্যার মতো বেআইনি রাস্তা বেছে নিয়েছে। এ ধরনের কাজ দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ কমায় না; বরং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।

নতুন বাহিনী ও বন্দুকযুদ্ধের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের ‘নিরাপদ পাঞ্জাব’ রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সিসিডি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্ধর্ষ অপরাধী ও আন্তজেলা গ্যাং দমনের লক্ষ্য নিয়ে এ বিশেষায়িত বাহিনী যাত্রা শুরু করে।

কিন্তু সিসিডি গঠনের মাত্র আট মাসের মধ্যেই পাঞ্জাবে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়। এইচআরসিপির তথ্যমতে, এ সময়ে অন্তত ৬৭০টি বন্দুকযুদ্ধে ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। অথচ এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালজুড়ে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ মিলিয়ে এ সংখ্যা ছিল ৩৪১। অর্থাৎ একটি প্রদেশেই ৮ মাসে নিহত মানুষের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। বন্দুকযুদ্ধে বেশি মারা গেছেন লাহোরে। এরপর রয়েছে ফয়সালাবাদ ও শেখুপুরা।

এ বাহিনী (সিসিডি) সাধারণ পুলিশের নিয়মের বাইরে গিয়ে একটি ‘আলাদা ক্ষমতার উৎস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এমনভাবে কাজ করছে যেন তাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।

যেভাবে সাজানো হয় ‘বন্দুকযুদ্ধ’

এইচআরসিপির মতে, সিসিডি টিমের প্রতিটি অভিযানের গল্প শুরু হয় এভাবে—গভীর রাতে বা কোনো পুলিশি তল্লাশিতে মোটরসাইকেল আরোহী কয়েকজন ‘সন্দেহভাজন’কে থামার সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা থামার বদলে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। পুলিশ তখন ‘আত্মরক্ষার্থে’ পাল্টা গুলি চালায়। গোলাগুলির একপর্যায়ে মূল সন্দেহভাজন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকেন এবং বাকি সহযোগীরা অন্ধকারে পালিয়ে যান।

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, অসংখ্য এফআইআরে দেখা গেছে—গুলিবিদ্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা ব্যক্তি মৃত্যুর ঠিক আগে চেতনা ফিরে পান এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, এমনকি অপরাধের দীর্ঘ ফিরিস্তি দিয়ে তবে মারা যান। কমিশনের দাবি, এগুলো বাস্তব ঘটনা নয়; বরং একই বয়ান বারবার ‘কপি-পেস্ট’ করে তৈরি করা বিবরণ।

সরকার ও পুলিশের যুক্তি

মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ দাবি করেছেন, সিসিডির অভিযানের কারণে পাঞ্জাবে অপরাধের হার কমেছে।

সিসিডি আদালতকে জানিয়েছে, গত সাত মাসে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ কমেছে।

এ বিভাগ বলছে, তারা আন্দাজে কাউকে ধরছে না; বরং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বড় বড় অপরাধী চক্র খুঁজে বের করে নির্মূল করছে। তারা একে ‘আধুনিক পুলিশিং মডেল’ বলে দাবি করছে।

সিসিডি এইচআরসিপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, অসংখ্য এফআইআরে দেখা গেছে—গুলিবিদ্ধ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা ব্যক্তি মৃত্যুর ঠিক আগে চেতনা ফিরে পান এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, এমনকি অপরাধের দীর্ঘ ফিরিস্তি দিয়ে তবেই মারা যান।

আড়ালে যা ঘটছে

তবে এইচআরসিপি বলছে অন্য কথা। অনেক পরিবারেরই অভিযোগ, পুলিশ তাদের চাপ দিচ্ছে, যাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের মরদেহ দাফন করা হয়। পুলিশ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা এইচআরসিপি কিংবা আল–জাজিরার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আল–জাজিরাকে বলেন, ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থা এবং দ্রুত ‘অপরাধ দমনের সাফল্য’ দেখানোর রাজনৈতিক চাপই পুলিশকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করছে।

Read full story at source