ইসরায়েলি হামলার মধ্যেই রমজান শুরু গাজাবাসীর

· Prothom Alo

  • ইসরায়েলি হামলা ও একটি নড়বড়ে ‘যুদ্ধবিরতির’ মধ্যে এবারের রমজান শুরু হয়েছে। 

    Visit amunra.help for more information.

  • বাজারে কিছু খাবার পাওয়া গেলেও দাম আকাশচুম্বী। অধিকাংশ মানুষের হাতে অর্থ নেই। 

ফিলিস্তিনের গাজা মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থীশিবির। শিবিরের জরাজীর্ণ তাঁবুর ভেতর রঙিন কাগজ দিয়ে সাজসজ্জা করছিলেন মাইসুন আল-বারবারাউই। দেয়ালে ঝুলছে শিশুদের আঁকা কিছু ছবি। অভাবের সংসারে অনেক কষ্টে ৯ বছর বয়সী ছোট ছেলে হাসানের জন্য পবিত্র রমজানের একটি লণ্ঠন (ফানুস) কিনেছেন তিনি। ক্লান্ত মুখে একটু হাসির ঝিলিক ফুটিয়ে মাইসুন বলেন, সামর্থ্য নেই বললেই চলে। তারপরও বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোই বড় কথা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি তৃতীয় রমজান। গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকাটিতে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। একটি নড়বড়ে ‘যুদ্ধবিরতির’ মধ্যে এবারের রমজান শুরু হয়েছে। মাইসুনের ভাষায়, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। মাঝেমধ্যে গোলা বর্ষণ হচ্ছে। তবে যুদ্ধের চরম সময়ের তুলনায় এখন গোলা বর্ষণের তীব্রতা কিছুটা কম।

সংঘাতের মধ্যে গাজাবাসীর এটি তৃতীয় রমজান। গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

অভাবের ঘরে আনন্দের চেষ্টা

দক্ষিণ-পূর্ব গাজায় নিজের বাড়ি হারিয়ে দুই বছর ধরে যাযাবরের মতো এক শরণার্থীশিবির থেকে অন্য শিবিরে ঘুরছেন মাইসুন। বুরেইজ শিবিরের একটি তাঁবুতে আপাতত তাঁর ঠাঁই হয়েছে। কয়েক দিন আগে ইসরায়েলের ড্রোন থেকে ছোড়া গুলিতে তাঁর তাঁবুর দেয়ালে বেশি কিছু ফুটো তৈরি হয়েছে। মাইসুন বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করি যেন যুদ্ধ আর ফিরে না আসে, সেনাবাহিনী যেন আমাদের মাটি ছেড়ে চলে যায়।’

প্রথম রোজার ইফতারিতে কী খাবেন, তা নিয়ে মাইসুনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে শত কষ্টের মধ্যেও মাইসুন শিবিরে প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেন এবং ইফতারের আগে অন্যদের জন্য রুটি তৈরি ও খেজুর বণ্টন করে দেওয়ার কাজ করছেন। তিনি জানান, তাঁবুর চারপাশের প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে দুঃখ ভাগাভাগি করেই তাঁরা বেঁচে আছেন।

দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ও বর্তমান আতঙ্ক

গাজাবাসীর মনে গত রমজানের দুঃসহ স্মৃতি আজও টাটকা। গত বছরের ১৯ মার্চ, অর্থাৎ রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব সীমান্ত পথ। ফলে দেখা দিয়েছিল চরম মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ। সেই স্মৃতি মনে করে মাইসুন আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, ‘সবাই বলছে, খাবার মজুত করো, ময়দা কিনে রাখো—যুদ্ধ নাকি আবার শুরু হয়েছে। গত রমজান ছিল দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের সংমিশ্রণ। আমার ছোট ছেলেটা খাবারের কষ্টে মারা যেতে বসেছিল। ভাবতে পারেন?’ গত অক্টোবরে গাজায় নতুন করে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিরতি এখনো বজায় থাকলেও তা বেশ ভঙ্গুর। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মতে, বাজারে কিছু খাবার পাওয়া গেলেও দাম আকাশচুম্বী। অধিকাংশ মানুষের হাতে অর্থ নেই। ফলে তাঁরা ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।

শূন্য থালার হাহাকার

গাজার দেইর আল-বালাহ শিবিরের ৫৫ বছর বয়সী মা হানান আল-আত্তার। উত্তর গাজার বাইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১৫ জন সদস্য নিয়ে তিনি এখানে একটি তাঁবুতে থাকছেন। প্রথম রমজানে একটি ত্রাণ সংস্থার ফুড পার্সেল পেয়ে তাঁর মুখে হাসি ফুটেছে। পার্সেলের ভেতর থাকা খেজুর, তেল, ডাল আর হালুয়া দেখে তিনি উৎফুল্ল। তবে এ খুশির আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ক্ষত।

গ্যাসের সিলিন্ডার যখন ‘গুপ্তধন’

গাজায় এখন রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট। দুই বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে লাকড়ির আগুনে রান্না করছেন হানান। অনেক কষ্টে জমানো কিছু টাকা দিয়ে রমজানের প্রথম দিন এক কেজি মাংস আর আলু কিনেছেন তিনি। লুকানো ৮ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার বের করে তিনি জানান, এটি তাঁর কাছে ‘গুপ্তধনের’ মতো। 

গাজাবাসীর কাছে এবারের রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। হানান বা মাইসুন সবার একটাই প্রার্থনা ‘এই রমজান যেন শান্তি নিয়ে আসে, যেন আবার সেই দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কবলে পড়তে না হয়। আর আমরা যেন নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে পারি।’ 

Read full story at source